অ
ভুক্তি সংখ্যা
২২১ টি
- অকর্ণ২– বিশেষ্য, কর্ণশূন্য; অঙ্গরাজ মহাবীর কর্ণের শূন্যতা; (তুলমূলক– অরাম বা অরাবণ।” –মেঘনাদবধ কাব্য)। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ (অভাবার্থে) + কর্ণ (সূতপুত্র রাধেয়) = অঙ্গরাজ মহাবীর কর্ণ। মহাবীর কর্ণ: মহাভারতের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র অঙ্গরাজ কর্ণ। অসামান্য বীরত্ব, দানশীলতা, বন্ধুত্বের প্রতি নিষ্ঠা এবং জীবনের গভীর করুণ পরিণতির জন্য তিনি ভারতীয় মহাকাব্য-পরম্পরায় এক স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন। কুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র হয়েও সামাজিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে সারাজীবন পরিচয়সংকট ও অবমাননার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম, দুর্যোধনের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অবিচলতা তাঁকে মহাভারতের সবচেয়ে জটিল ও মানবিক চরিত্রগুলির একটিতে পরিণত করেছে। কর্ণের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর কাহিনি। কুন্তী ঋষি দুর্বাসার কাছ থেকে এমন এক মন্ত্র লাভ করেছিলেন, যার সাহায্যে তিনি যে কোন দেবতাকে আহ্বান করতে পারতেন। কৌতূহলবশত সেই মন্ত্রের প্রয়োগ করে তিনি সূর্যদেবকে আহ্বান করেন। সূর্য সহবাসে তাঁর গর্ভে কর্ণের জন্ম হয়। জন্ম থেকেই তাঁর দেহে ছিল সহজাত কবচ ও কুণ্ডল, যা তাঁকে বিশেষ সুরক্ষা দিত। অবিবাহিত অবস্থায় সন্তান জন্মানোর সামাজিক লজ্জার ভয়ে কুন্তী নবজাতককে একটি পেটিকায় রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেন। অধিরথ নামে এক সারথি এবং তাঁর স্ত্রী রাধা শিশুটিকে খুঁজে পেয়ে লালন-পালন করেন। তাঁদের কাছেই কর্ণ বড় হয়ে ওঠেন। পালক-মাতার নাম অনুসারে তিনি রাধেয় নামেও পরিচিত হন। কর্ণ শৈশব থেকেই অস্ত্রশিক্ষা ও যুদ্ধে পারদর্শী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। কিন্তু সারথির পুত্র হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাঁকে বারবার সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি পরশুরামের কাছে ব্রাহ্মণের ছদ্মপরিচয়ে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে পরশুরাম তাঁকে অভিশাপ দেন যে, জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে তিনি শেখা বিদ্যার প্রয়োজনীয় মন্ত্র ভুলে যাবেন। আরেকটি অভিশাপের কাহিনিতে বলা হয়, অসাবধানতাবশত এক ব্রাহ্মণের গাভী নিহত হওয়ায় কর্ণকে অভিশাপ দেওয়া হয় যে, যুদ্ধের সংকটকালে তাঁর রথের চাকা মাটিতে বসে যাবে। এই অভিশাপগুলি পরবর্তী কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে তাঁর পরিণতির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে আছে। হস্তিনাপুরে কৌরব ও পাণ্ডব রাজপুত্রদের অস্ত্রবিদ্যার প্রদর্শনীতে কর্ণ অর্জুনের সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। কিন্তু তাঁর বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তিনি অর্জুনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপক্রম হন। সেই সময় দুর্যোধন তাঁকে অঙ্গদেশের রাজা ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর থেকেই কর্ণ অঙ্গরাজ নামে পরিচিত হন। দুর্যোধনের এই সম্মানকে কর্ণ সারাজীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য বজায় রাখেন। তাঁদের বন্ধুত্ব মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; তবে এই আনুগত্যই কর্ণকে এমন এক পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে, যার নৈতিক অবস্থান নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। কর্ণের দানশীলতা তাঁকে মহাভারতের লোকপ্রিয় কিংবদন্তিতে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি দানবীর কর্ণ নামে পরিচিত। কথিত আছে, প্রার্থনাকারীকে তিনি কখনও খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের আগে ইন্দ্র ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তাঁর কাছে এসে সহজাত কবচ ও কুণ্ডল প্রার্থনা করেন। কর্ণ বুঝতে পেরেছিলেন, এগুলি দান করলে তাঁর প্রাণরক্ষার স্বাভাবিক সুবিধা নষ্ট হবে; তবু তিনি নিজের দানপ্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে সেগুলি দিয়ে দেন। বিনিময়ে ইন্দ্র তাঁকে একবার ব্যবহারযোগ্য শক্তিশালী অস্ত্র প্রদান করেন। এই কাহিনিতে কর্ণের উদারতা যেমন প্রকাশিত, তেমনি তাঁর আত্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত করুণ পরিণতির পূর্বাভাসও মেলে। কর্ণের জীবনের সবচেয়ে জটিল দিকগুলির একটি তাঁর জন্মপরিচয়। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের আগে কুন্তী তাঁর কাছে গিয়ে প্রকাশ করেন যে, কর্ণ আসলে তাঁরই জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পাণ্ডবদের বড় ভাই। কুন্তী তাঁকে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু কর্ণ দুর্যোধনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন করতে অস্বীকার করেন। তিনি কুন্তীকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, অর্জুন ছাড়া অন্য কোন পাণ্ডবকে তিনি হত্যা করবেন না; ফলে কুন্তীর পাঁচ পুত্রই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে—হয় অর্জুন, নয় কর্ণ। এই সিদ্ধান্ত তাঁর আনুগত্যের গভীরতা প্রকাশ করে, আবার তাঁর জীবনের অনিবার্য বিয়োগান্ত পরিণতিকেও তীব্র করে তোলে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ কৌরবপক্ষে প্রধান যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ভীষ্ম সেনাপতিত্বে থাকাকালে তাঁদের পারস্পরিক বিরোধের কারণে কর্ণ প্রথমদিকে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেননি বলে মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে। পরে দ্রোণের মৃত্যুর পর তিনি কৌরবসেনার সেনাপতি হন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্জুনকে পরাজিত করা। দুই মহাবীরের সংঘর্ষ মহাভারতের যুদ্ধবর্ণনার অন্যতম চূড়ান্ত মুহূর্ত। কিন্তু যুদ্ধের সংকটকালে কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায় এবং তিনি তা উদ্ধারের চেষ্টা করেন। সেই সময় কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্ণের পূর্ববর্তী অন্যায়গুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। অর্জুনের অস্ত্রাঘাতে কর্ণ নিহত হন। তাঁর মৃত্যু মহাভারতের সবচেয়ে করুণ ও বিতর্কিত ঘটনাগুলির একটি। কর্ণকে নিছক মহাবীর বা নিছক ত্রুটিপূর্ণ মানুষ—কোন একটিমাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান, দানশীল ও বন্ধুত্বে অবিচল; একই সঙ্গে দুর্যোধনের প্রতি আনুগত্যের কারণে অন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়িয়েছিলেন। দ্রৌপদীর অপমানের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা এবং অভিমন্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর চরিত্রের নৈতিক জটিলতাকে স্পষ্ট করে। সামাজিক অবমাননা তাঁর মধ্যে যে ক্ষোভ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল, তা তাঁর অনেক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল; তবে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর সব কাজকে ন্যায়সংগত করে না। অঙ্গরাজ কর্ণের জীবন তাই জন্মপরিচয়, সামাজিক বৈষম্য, কৃতজ্ঞতা, বন্ধুত্ব, আত্মসম্মান, দানশীলতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার এক জটিল আখ্যান। নিজের প্রকৃত পরিচয় অজানা রেখে তিনি যে জীবন কাটিয়েছেন, তা তাঁকে একদিকে মহাবীরের মর্যাদা দিয়েছে, অন্যদিকে গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন করেছে। মহাভারতের অন্যান্য চরিত্রের মতো কর্ণও আলো ও অন্ধকারের সমন্বয়ে গঠিত। তাঁর জীবনের মহত্ত্ব যেমন স্মরণীয়, তেমনি তাঁর ভুল সিদ্ধান্তগুলিও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ব্যক্তিগত আনুগত্য ও প্রতিজ্ঞা মহৎ গুণ হলেও ন্যায়-অন্যায়ের বিচার থেকে মানুষকে মুক্তি দেয় না।
- অকর্ণ৩– বিশেষ্য, হালশূন্য (নৌকা) [প্রচল অভাব]। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন = অ (নাই) কর্ণ (হাল) যার–বহুব্রীহি সমাস।
- অকর্ণধার– বিশেষণ, ১ কর্ণধারহীন; নাবিকহীন; চালকহীন। ২ কর্ণধার নয় এমন; অনাবিক। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ = ন + কর্ণ + √ধৃ + অ; ন + কর্ণধার।
- অকর্তা– বিশেষণ, ১ যে কর্তা নয় (কে কর্তা কে অকর্তা বুঝি না); কর্তৃভিন্ন; অপ্রভু। ২ যে কিছু করে না; অকারক; কর্তৃত্বহীন। ৩ নিষ্ক্রিয়, ক্রিয়াহীন। ৪ অনির্মাতা। ৫ অপ্রধান। ৬ (ব্যাকরণে) কর্তৃকারক ভিন্ন অন্য কারক। ৭ সাংখ্যপুরুষ। ৮ কর্তৃভিন্ন জন; কর্তা ভিন্ন অন্যজন; সহকারী কর্তা। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ-কর্ত্তৃ > ন + √কৃ + তৃ; ন = অ + কর্তা। লিঙ্গান্তর: স্ত্রীলিঙ্গ– অকর্ত্রী।
- অকর্তৃত্ব– বিশেষ্য, ১ কর্তৃত্বহীনতা; প্রাধান্যহীনতা; কর্তৃত্বের অভাব; অপ্রভুত্ব। ২ কর্তৃত্বাভিমানরাহিত্য; কর্তৃত্বের অহংকারহীনতা। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন + কর্তৃ + ত্ব।
- অকর্তন– বিশেষ্য, অচ্ছেদন; যে কর্তন করতে পারে না।। বিশেষণ, বামন; খর্ব; ঈষৎ খর্ব। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন = অ + কর্ত্তন। টীকা: খর্ব ব্যক্তি উচ্চস্থানের ফল হাত বাড়িয়ে পাড়তে পারে না, তজ্জন্য অকর্তন শব্দ দ্বারা খর্ব বা বামনকে বোঝায় (–বাচস্পত্য)।
- অকর্তব্য– বিশেষণ, ১ যা কর্তব্য নয়; করার অনুপযুক্ত; অননুষ্ঠেয়; অকাজ; অকার্য; অকরণীয়। ২ করা উচিত নয় এমন; অনুচিত। ৩ যার কর্তব্য নেই; ক্রিয়াহীন; কূটস্থ চৈতন্য। পদান্তর: বিশেষ্য– অকর্তব্যতা। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন = অ + কর্ত্তব্য। কৃ–করা + তব্য (ভাববাচ্যে)–করণ-যোগ্য।
- অকর্ম– বিশেষ্য, ১ অপকর্ম; অকার্য; অকাজ; গর্হিত কাজ; কুকার্য; কুকাজ; অপকর্ম; অপ্রশস্ত কর্ম; দুষ্কৃত; অবৈধ কর্ম। ২ কর্মাভাব; কর্মের অভাব; অক্রিয়া; নিষ্ক্রিয়তা; ক্রিয়াহীনতা; অবিহিতব্যাপার। ৩ কর্মাকরণ; হীনকর্ম; দ্যূতাদি (একের কথা অন্যকে বিক্রি করা)– মহাভারত)। ৪ [গীতা] কর্মাকরণ; কর্মের অকরণ; কর্মরাহিত্য; কর্মসন্ন্যাস; কর্মত্যাগ বা বিসর্জ্জন। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন = অ + কর্ম্মন্ (√ কৃ + মন্)। কথ্য অকম্মো। প্রয়োগ: বিশেষ্য, ১ অপকর্ম – সম ধর্ম্মাধর্ম্ম, সম কর্ম্মাকর্ম্ম, শত্রুমিত্র সমতুল। – ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। ২ কর্মত্যাগ – জীবন্মুক্ত সন্ন্যাসীর কর্ম্মও নাই অকর্ম্ম ও নাই।
- অকর্মক– (ব্যাকরণ) যে ক্রিয়াপদের কর্মপদ থাকে না; কর্মপদহীন; Intransitive (অকর্মক ক্রিয়া—যাওয়া, মরা ইত্যাদি)। বিশেষণ, ১ যার কর্ম নাই; কর্মহীন; কর্মশূন্য; যে কর্ম করছে না; কর্মরহিত; বেকার। ২ কার্যরহিত; নির্ব্যাপার। ৩ কর্মে অনুপযুক্ত। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অকর্মন্ + ক; ন = অ (নাই) কর্ম্মন্ (কর্ম্ম) যার + ক; নঞ্ বহুব্রীহি সমাসান্ত ক (কপ্); স্ত্রী. অকর্মিকা।
- অকর্মকাণ্ড– বিশেষ্য, ১ অপকর্মের ঘটা; অন্যায় বা মন্দ কাজের ব্যাপক আয়োজন। ২ অনুচিত, অনৈতিক বা নিন্দনীয় কাজের সমষ্টি; কুকর্মের কাণ্ড; দুষ্কর্ম। ৩ বিশৃঙ্খল বা অনভিপ্রেত কাজকর্ম; এমন কাণ্ডকারখানা যা বিরক্তি, ক্ষোভ বা নিন্দার উদ্রেক করে। ৪ অনর্থকর বা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের প্রকাশ; বোকামি বা অবিবেচনাপ্রসূত আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অকর্মন্ (অ + কর্মন্, অকর্ম—অনুচিত কর্ম) + কাণ্ড (√কন্ দীপ্তি + ড-ক, কাণ্ড—ঘটনা, বিষয় বা কাজের সমষ্টি)।
- অকর্মকৃৎ১– যে অন্যায় বা নিষিদ্ধ কাজ করে। বিশেষণ, কুকর্মকারক; কুকর্মকারী; কুকৃতী; দুর্বৃত্ত; দুষ্কর্মকারী; দুষ্কৃতকারী; দৃষ্কৃতী। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ + কর্মন্ + √কৃ + ক্বিপ্; কুকর্ম করে যে; উপপদ তৎপুরুষ সমাস। এখানে ‘অকর্ম্মন্’ উপপদ এবং √কৃ ধাতুর সঙ্গে ক্বিপ্ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে।
- অকর্মকৃৎ২– যে কোন কর্ম করে না বা কর্মে প্রবৃত্ত হয় না। বিশেষণ, যে কর্মকৃত নয় অর্থাৎ কর্ম করে না; কর্মহীন; নিষ্ক্রিয়; নির্ব্যাপার; কর্মবিমুখ। প্রয়োগ: ১ কর্মহীন – ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্ম্মকৃৎ। অর্থাৎ কেউ কখন এক মুহূর্তের জন্যও কর্ম না করে থাকতে পারে না। – গীতা। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ (নঞ্) + কর্ম + কৃৎ; যে কর্ম করে না; নঞ্ তৎপুরুষ। এখানে ‘অ’ নঞর্থক উপসর্গ নয়, নঞ্ সমাসের পূর্বপদ।
- অকর্মঠ– বিশেষণ, ১ অকর্মক্ষম; অকর্মণ্য। ২ অলস; কুঁড়ে। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ + কর্ম্ম + ঠ (স্থ—শক্তি, কুশল)। টীকা: সংস্কৃত কর্ম্ম + ঠ (কর্তৃবাচ্য) ক্ষমতার্থে—উভয় দৈহিক এবং কৌশল জ্ঞান সম্বন্ধে। ‘থ’র কঠোর ও দৃঢ়তর রূপ ‘ঠ’। সংস্থা >; স্থান ও থাকা বোধক, সুতরাং কর্মে স্থিতি জ্ঞাপক। কিন্তু শক্তি ও কৌশল জ্ঞান না থাকলে স্থান অধিকার করা যায় না। তাই কর্মঠ অর্থে কর্মক্ষম।
- অকর্মণ্য– যে লোক কোন কাজের নয় এমন, অপদার্থ, অক্ষম; অথবা, যে বস্তু কোন কাজে লাগে না। বিশেষণ, ১ যে কর্মণ্য বা কর্মক্ষম নয়; কর্মে অসমর্থ; অকুশল; কর্মের অযোগ্য; যার কর্ম করার ক্ষমতা নেই; কর্মক্ষম নয় এমন; অপটু; অকেজো। ২ বৈধ কর্মে অপ্রশস্ত বা নিষিদ্ধ; শাস্ত্রীয় ক্রিয়ায় অবিহিত। ৩ অকেজো; অব্যবহার্য; যে বস্ত কোন কাজেই লাগে না; অচল; বিকল; ব্যবহারের অযোগ্য। পদান্তর: বিশেষ্য, অকর্মণ্যতা—কর্মে অযোগ্যতা বা অপটুতা। প্রয়োগ: বিশেষণ, ১ অকেজো – সে ক্রমাগত রোগে ভুগিয়া এক প্রকার অকর্ম্মণ্য হইয়া পড়িয়াছে। ২ অসমর্থ – এই অকর্ম্মণ্য হাতীটাকে দূর করিয়া দাও – – শিশুশিক্ষা, তৃতীয় ভাগ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার। ৩ কর্মের অযোগ্য – পরস্পরের স্বভাব-পরীক্ষায় যে বিবেক ও ধৈর্য্যের প্রয়োজন, তাহা ঐ সময়ে অকর্ম্মণ্যপ্রায় থাকে… – পারিবারিক প্রবন্ধ, ভূদেব মুখোপাধ্যায়। ৪ নিষিদ্ধকর্ম – অকর্ম্মণ্যং তিথিমলং বিদ্যাদেকাদশীং বিনা। – তিথ্যাদিতত্ত্ব। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন = অ + কর্ম্মণ্ + য; নঞ্ তৎপুরুষ, স্ত্রীলিঙ্গ অকর্মণ্যা।
- অকর্মণ্যতা– বিশেষ্য, অক্ষমতা, অযোগ্যতা; কর্মে অযোগ্যতা বা অপটুতা। পদান্তর: বিশেষণ, অকর্মণ্য। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ন = অ + কর্মণ্য + তা।
- অবীরা– পতিপুত্ররূপ বীর নেই যে নারীর।
- অসূর্যম্পশ্যা– যে অন্তঃপুরচারিণী কখন সূর্যেরও মুখ দেখতে পায় না; লোকনয়নান্তরালেস্থিতা; যাকে পতি ভিন্ন অন্য কোন পুরুষ দেখতে পায় না।
- অ্যা– ক্রিয়াপ্রত্যয়: অনন্তার্থে অসমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যয়বিশেষ। [অপ্রচলিত]। ব্যুৎপত্তি: ইয়া > ইআ > য়া > য়্যা > অ্যা; উচ্চারণানুসারে। টীকা: ‘ইয়া’ প্রত্যয়ের ধ্বনিগত বিবর্তনে ‘অ্যা’ রূপের উৎপত্তি হয়েছে। যেমন—থুইয়া > থুয়া > থুয়্যা > অ্যা। এই প্রত্যয় কঅ্যা, ছুঁঅ্যা, পাঠাঅ্যা, হঅ্যা প্রভৃতি ক্রিয়ারূপে দেখা যায়।
- অ্যাঁ– অব্যয়, ১ বিস্ময়, বিস্ময়সূচক উক্তি বা আকস্মিক চমক প্রকাশে ব্যবহৃত ধ্বনি। ২ প্রশ্ন, সংশয় বা কোন কথা স্পষ্টভাবে শুনতে না পাওয়ার ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত অব্যয়। ৩ আহ্বানে সাড়া দিতে বা ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানাতে ব্যবহৃত অব্যয়। ৪ অনভিপ্রেত বা অপ্রত্যাশিত বিষয়ে হঠাৎ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, ইতস্তত ভাব বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা প্রকাশে ব্যবহৃত অব্যয়। প্রয়োগ: অব্যয়, ১ হাঁ, স্ত্রীলোক – … বড় সুন্দরী বটে, অ্যাঁ অচ্ছা ডাক, হান্ফেকে ডাক। – মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ২ ইতস্তত – আশমানি।– কথা কওনা যে? দিগ্গজ।– “অ্যাঁ অ্যাঁ, তা তা তা তা”– বাঙ্নিষ্পত্তি হইয়া উঠিল না। আশমানি।– তবে কি পারিবে না? দিগ্গজ।– অ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ, তা তা–স্বামিঠাকুরকে বলিয়া আসি। – বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ৩ বিস্ময় – ভক্ত।– (মালা জপিতে জপিতে) অ্যাঁ! অ্যাঁ! – বলিস কি রে! – মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ৪ বিস্ময় – অ্যাঁ! কি সর্ব্বনাশ! নিমাই কোথা গেল! – গিরিশ গ্রন্থাবলী। ৫ সাড়া – গদা।– ও হানিফ, এদিকে আয়! হানিফ। – অ্যাঁ! কি? – মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
- অ্যাকা– বিশেষণ, একাকী; একেলা; একলা; নিসঙ্গ। প্রয়োগ: ১ একা; নিসঙ্গ। – গেল যেই আমায় ফেলিয়া অ্যাকা/ ধূমাবতীরমূরতি ডাকিনী এক দিল সেই দ্যাখা। – স্বপ্নপ্রয়াণ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ব্যুৎপত্তি: বাংলা এক > অ্যাক + আ প্রত্যয়।
- অ্যাকেঅ্যাকে– বিশেষণ, এক এক করে; একজনের পরে একজন করে। ব্যুৎপত্তি: বাংলা এক + এ> একে> অ্যাকে; একেএকে > অ্যাকেঅ্যাকে। প্রয়োগ: বিশেষণ, ১ নিসঙ্গ – এমন যে বন্ধু তারা (তারকা) / স্বচ্ছন্দে এখন তারা / তা’রে (শশীকে) ফেলে যায় অ্যাকেঅ্যাকে – স্বপ্নপ্রয়াণ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।