অকম্পন
বিশেষ্য
প্রয়োগ
বিশেষ্য
- ১.নির্ভীক – অকম্পন নাম তার কম্পে না কখন। – রামায়ণ, কৃত্তিবাস
- ২.নির্ভীক – অকম্পন রণে ধীর, যথা ভূধর, পড়েছে সহ অতিকায় রথী। – মেঘনাদবধ কাব্য, মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ব্যুৎপত্তি
সংস্কৃত ন = অ-কম্প (কাঁপা) + অন্ (ভাববাচ্য)।
অকম্পন
রামায়ণের বিবরণ অনুযায়ী, অকম্পন ছিলেন রাক্ষসরাজ রাবণের অন্যতম প্রধান সেনাপতি এবং সম্পর্কে রাবণের মামা। তিনি দৈত্য সুমালী এবং তাঁর পত্নী কেতুমতির সন্তান। সুমালী ও কেতুমতির মোট ১৪টি সন্তানের মধ্যে অকম্পন ছিলেন দ্বিতীয় পুত্র।
দণ্ডকারণ্যের জনস্থানে যখন শ্রীরামচন্দ্র একাকী রাক্ষস সেনাপতি খর, দূষণ ও ত্রিশিরা সহ প্রায় ১৪ হাজার রাক্ষস সৈন্যকে বিনাশ করেন, তখন অকম্পন সেই প্রাণঘাতী যুদ্ধ থেকে বেঁচে লঙ্কায় পালিয়ে যান। তিনি লঙ্কায় পৌঁছে রাবণকে এই ভয়াবহ পরাজয়ের সংবাদ দেন।
অকম্পন রাবণকে সতর্ক করে জানান যে, রামের বীরত্ব ও ধনুবিদ্যা এমন যে দেবতা বা অসুর—কারোর পক্ষেই তাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করা সম্ভব নয়।
বাল্মীকি রামায়ণের প্রচলিত পাঠ্য ও আখ্যান অনুযায়ী, রামের শক্তি উপলব্ধি করে অকম্পনই প্রথম রাবণকে ছলের মাধ্যমে সীতাকে অপহরণ করার পরামর্শ দেন। তাঁর যুক্তি ছিল—সীতাই রামের প্রাণস্বরূপ, তাই সীতা অপহৃত হলে রাম শোকে ভেঙে পড়বেন এবং তাঁকে পরাস্ত করা সহজ হবে।
রামায়ণের সমালোচনামূলক সংস্করণে (Critical Edition) এই পরামর্শের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও আরণ্যক কাণ্ডের প্রচলিত পাঠে এটি অকম্পনের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত।
রাম-রাবণের যুদ্ধের সময় আশ্বিন মাসের প্রতিপদ তিথিতে রাবণ চতুরঙ্গ সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধে নামলে অকম্পন বানর সেনার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। তাঁর রথ ও ধনুর্বাণে বানর বাহিনী ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে শ্রী হনুমান অকম্পনের মুখোমুখি হন। উভয়ের মধ্যে তীব্র সংগ্রামের পর, হনুমান একটি বিশাল উপড়ানো বৃক্ষ নিক্ষেপ করে অকম্পন ও তাঁর রথ চূর্ণ করে দেন। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রেই অকম্পনের সলিল সমাধি ঘটে (বাল্মীকি রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড, সর্গ ৫৬)।
রামায়ণের রাক্ষস সেনাপতি ছাড়াও পৌরাণিক সাহিত্যে ‘অকম্পন’ নামে আরও কিছু ব্যক্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়:
বায়ু পুরাণ: বায়ু পুরাণের মতে, মহর্ষি কশ্যপের ঔরসে এবং খসার গর্ভে জন্ম নেওয়া এক বিশেষ রাক্ষসের নাম অকম্পন।
ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ: এই পুরাণে অকম্পনকে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর রাজসভার অন্যতম প্রধান অসুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
মহাভারত (রাজা অকম্পন): মহাভারতের দ্রোণ পর্বের ৫২তম অধ্যায়ে ব্যাসদেব (কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন) এক রাজা অকম্পনের গল্প তুলে ধরেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অভিমন্যুর মৃত্যুর পর রাজা যুধিষ্ঠির গভীর শোকে আচ্ছন্ন হলে, ব্যাসদেব তাঁকে শান্ত করার জন্য সত্যযুগের রাজা অকম্পনের কাহিনী শোনান। যুদ্ধে রাজা অকম্পনের পুত্র নিহত হলে তিনি পুত্ৰশোকে ভেঙে পড়েন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর কাছে এসে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ‘মৃত্যুর উৎপত্তি’ এবং এর অনিবার্যতার ব্যাখ্যা দিয়ে রাজাকে শোকমুক্ত করেছিলেন।
রামায়ণের প্রেক্ষাপটে অকম্পন চরিত্রটি একজন দক্ষ সংবাদ সংগ্রাহক, কৌশলী পরামর্শদাতা এবং বীর যোদ্ধা হিসেবে ফুটে উঠে। যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তিনি রাবণকে সরাসরি রামের মুখোমুখি না হয়ে বিকল্প কৌশলের (সীতা অপহরণ) পথ দেখিয়েছিলেন, যা পুরো রামায়ণের গতিপথকে পরিবর্তন করে দেয়। লঙ্কার প্রতি আনুগত্য রেখে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করে হনুমানের হাতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।