অ
মোট ভুক্তি: ৩৪ টি
- অ১– অকার; বাংলা বর্ণমালার আদ্যবর্ণ; আলিকালির আদ্য অক্ষর; আদ্য স্বর। পূর্বে চলিত বাঙলায় স্বরবর্ণকে ‘সিদ্ধি’ বলা হত, তার কারণ এই, প্রাচীন বৈয়াকরণেরা বর্ণমালার প্রথমেই সমস্ত স্বরবর্ণকে লিখেছেন এবং এদেশের প্রথানুসারে তাঁরা গ্রন্থারম্ভে ‘সিদ্ধিরস্তু’ (সিদ্ধি হউক) বলে মঙ্গলাচরণ করতেন। প্রথমে মঙ্গলাচরণ, তার পরে স্বরবর্ণ; এজন্য মঙ্গলাচরণের আদিশব্দ ‘সিদ্ধি’ হতে স্বরবর্ণের নাম ‘সিদ্ধি’ হয়েছে। উচ্চারণ: উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ, তাই কণ্ঠ্যবর্ণ; কিন্তু সংস্কৃতের ন্যায় বাংলার আ-কার দীর্ঘ নয়; অ-কারের ন্যায় হ্রস। সুতরাং কেবল আকৃতিতে বাংলায় অ-কার ও আ-কার, সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে চার প্রকার– (১) লঘু স্পৃষ্ট (অর্থ, অদ্বৈত ইত্যাদির অ); (২) স্পষ্ট (অতল, অজ, অন্যায় ইত্যাদির অ); (৩) লঘু বা অর্ধব্যক্ত ওকারের মত (কলিকা, রজনী, ললিত ইত্যাদির ক্, জ্, ল্ সংযুক্ত অ = অ̑, ক̑, জ̑, ল̑); (৪) পূর্ণব্যক্ত ওকারবৎ (অতিশয়, অনুরোধ ইত্যাদির অ বা মন, যদু ইত্যাদির ম্, য্ সংযুক্ত অ = ‘ওতিশয়’, ‘ওনুরোধ’, ‘মোন’ এবং ‘যোদু’)। পাণিনি সংবৃত-বিবৃত-ভেদে দুই প্রকার অকারের উল্লেখ করেছেন; সংবৃত অকারের উচ্চারণে গলনালীর সঙ্কোচ এবং বিবৃত অকারের উচ্চারণে গলনালীর বিবার অর্থাৎ প্রসারণ করতে হয়। অকার উচ্চারণে সংবৃত কিন্তু সন্ধিপ্রভৃতি প্রক্রিয়ায় বিবৃত (পাণিনি ১.১.৯)। একমাত্রাবিশিষ্ট বা হ্রস্ব অকারের দ্বিমাত্র বা দীর্ঘ উচ্চারণে আকার এবং ত্রিমাত্র বা প্লুত উচ্চারণে প্লুত অ৩-কার হয়। এরূপ মাত্রাভেদ থাকলেও এই ত্রিবিধ অকার সবর্ণ। সংস্কৃতে অ’র উচ্চারণ সাধারণতঃ হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত এবং উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত। সংস্কৃত ব্যাকরণমতে উচ্চারণভেদে অকার আঠার প্রকার– হ্রস্ব উদাত্ত, হ্রস্ব অনুদাত্ত ও হ্রস্ব স্বরিত; দীর্ঘ উদাত্ত, দীর্ঘ অনুদাত্ত ও দীর্ঘ স্বরিত; প্লুত উদাত্ত, প্লুত অনুদাত্ত, ও প্লুত স্বরিত। পুনরায় এই নয় প্রকারের অনুনাসিক ও অননুনাসিক ভেদে সর্বসমেত আঠার প্রকার। সংস্কৃত গুরুর মুখে না শুনে এই সকল উচ্চারণ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। সংস্কৃতের অন্যস্বরও হ্রস, দীর্ঘ, প্লুত উচ্চারিত হয়; কিন্তু বাংলায় দীর্ঘ স্বরও হ্রস স্বরের ন্যায় উচ্চারিত হয় তাই বাংলায় অ-ত্রয়ের ন্যায় অন্য হ্রস্ব দীর্ঘ স্বরেরও উচ্চারণগত প্রভেদ সামান্য। হিন্দি, মরাঠী প্রভৃতি ভাষার অ-কার ঈষদ্-বিবৃত, অর্থাৎ আ-কার ঘেঁষা। প্রাচীন বাংলায় চর্যাপদে ‘আঙ্গন’ ‘আন্তে’ (অন্তে) ইত্যাদির ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ‘আচেতন’ ‘আর্জ্জন’ ‘আণেক’ প্রভৃতি শব্দের আ-কার ঐরূপ উচ্চারণমূলক। আধুনিক বাংলায় ‘আগণা’ ‘আচষা’ ‘আতেলা’ ‘আলুণি’ প্রভৃতির আ-কার ঐরূপেই হয়েছে। সংস্কৃতের ‘শ্বাপদ’ ‘বিশ্বামিত্র’ প্রভৃতির এবং প্রাকৃতের ‘মাণংসী’ (মনস্বী) ‘পারোহ’ (প্ররোহ) ইত্যাদির আ-কার ঐরূপে দীর্ঘ। এতদ্ভিন্ন বাংলায় অ-কারের ও-কারবৎ উচ্চারণ আছে; যেমন– ‘অনুচর’ ‘অমনি’ ‘রসুই’ ‘লক্ষণ’ ইত্যাদি। কেবল হ্রস ও দীর্ঘস্বর গৃহিত হয়েছে। ব্রজবুলি এবং হিন্দিতে ঈষৎ স্পৃষ্ট বা লঘু আকারের ন্যায় উচ্চারিত, তাই ‘অতি’ অনেকটা ‘আতি’র মত। প্রাচীন বাংলা ‘অতি’ স্থলে ‘আতি’র প্রয়োগও দৃষ্ট হয়। আধুনিক শুদ্ধ উচ্চারণ ‘ওতি’। ‘অজ’র ‘অ’ উচ্চারণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণগুলির অকারান্ত উচ্চারণ বাঙলা ভাষারই বিশেষত্ব। সাধারণত অ পরে অকার বা আকারযুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে অকারের উচ্চারণ বজায় থাকে (অজ, অজা); ি, ী, ু, ূ, যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে ওকারবৎ (অতি, অতীত, অরুণ) এবং পরে ো থাকলে অ (অতো, অহো)। সংস্কৃত ও সংস্কৃতমূলক যাবতীয় ভাষায় হল্বর্ণ অকারের আশ্রয়ে উচ্চারিত হয়। তাই, অ-কার ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত হলে অন্যান্য স্বর রূপান্তর প্রাপ্ত হয়, কিন্তু অকারের চিহ্ন থাকে না। যথা– ক (ক্ + অ), খ (খ্ + অ) ইত্যাদি। অকার দীর্ঘ হলে বা সমস্বর দ্বিত্ব হলে দীর্ঘ অ-কার বা আ-কার হয়। সন্ধির এই সূত্রানুসারে নব + অঙ্কুর = নবাঙ্কুর হয়েছে, কেননা, প্রথম শব্দের শেষ ব-কারের শেষে অ-কার ও অঙ্কুরের শুরুতে অ-কার রয়েছে। বিবর্তন: পঞ্জাবের উত্তরে টাকরী নামক প্রদেশে টাকরী ভাষা প্রচলিত আছে, তা সংস্কৃত ভাষার অপভ্রংশ। কিন্তু সে ভাষায় স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণে মিলিত হয়ে রূপান্তরিত হয় না। যেমন ‘কা’ লিখতে তারা ‘কআ’, ‘কি’ লিখতে ‘কই’ ব্যবহার করে। সন্ধির নিয়মে একার বা ওকারান্ত পদের পরবর্তী অ লুপ্ত হলে মাত্রাহীন হকার ‘ঽ’ রূপ ধারণ করে। একে লুপ্ত অকার কহে ‘সোঽহম্’ (সঃ = সো + অহম্ এর অ = ‘ঽ’); নবঃ + অঙ্কুরঃ = নবোঽঙ্কুরঃ –এরূপ স্থলে বকারের পর বিসর্গ ওকারে পরিণত হল এবং অঙ্কুরের অকার লুপ্ত হয়ে গেল। প্রণব (ওঁ = অ + উ + ম) এর আদ্য অক্ষর। তন্ত্রে অকারের সৃষ্টি, অমৃত, ললাট, কণ্ঠ ইত্যাদি ১৭ প্রকার অর্থ আছে, কিন্তু বাংলায় সে সকল অর্থে প্রয়োগ নাই। অ প্রাচীন বাংলায় এ, ও, য়, এবং হ স্থলে বসত। এখন স্থলে ‘অখন’– “অখনে দেখিয়া আইস পুরী আপনার”– মুকু-জগ-বিজয়। রাখিও স্থলে ‘রাখিঅ’– “না কহিয় কার ঠাই রাখিঅ অন্তরে,”–চম্পককলিকা। নয়ন স্থলে ‘ন্অন’, নায়ক স্থলে ‘নাঅক’ ইত্যাদি। প্রাকৃতে ‘য়’ স্থলে ‘অ’ ব্যাকরণসঙ্গত। প্রাচীন বাংলায় কথার মাত্রাস্বরূপ– কিঅ, কেঅ, তুঅ, লঅ ইত্যাদি চণ্ডীদাসে দ্রষ্টব্য। বৌদ্ধ বা অতি প্রাচীন বাংলায় গ স্থলে– ‘গঅণ’ (গগণ)–চর্যাপদ ৮.২.১৪.৩ ইত্যাদি। চ স্থলে “অনিমিষ লোঅণ (লোচন)।” দোহাকোষ। জ স্থলে–‘গঅবর’ (গজবর), ‘গঅন্দ, গএন্দ’ (গজেন্দ্র)–চর্যাপদ ৮.২.১৪ ইত্যাদি। ‘তেঅ’ (তেজ)–বৌদ্ধগান ও দোহা। ‘নিঅমন’ (নিজমন)– চর্যাপদ। ত, ত্ত স্থলে– ‘পণ্ডিঅ’ (পণ্ডিত), ‘অদভূঅ’, ‘অমিঅ’, ‘অমিআহ’ (অদ্ভুত, অমৃত, অমিতাভ); ‘অনুঅর’, ‘বোহিচিঅ’ (অনুত্তর, বোধিচিত্ত)–বৌদ্ধগান ও দোহা। র স্থলে– ‘কঠিন পূহবিঅ’ (পৃথিবীর)–ঐ।
- অ২– বিশেষ্য, ১ [পুংলিঙ্গ] যে রক্ষা করে; বিষ্ণু। ২ [পুংলিঙ্গ] ব্রহ্মা। ৩ [পুংলিঙ্গ] শিব। ৪ [পুংলিঙ্গ] বায়ু। ৫ [পুংলিঙ্গ] বৈশ্বানর। ৬ [পুংলিঙ্গ] ব্রহ্ম। ৭ [স্ত্রীলিঙ্গ] [ ঙীপ্, ঈ] লক্ষ্মী। তন্ত্রে অকারের আরও অনেকগুলো পর্যায় দেখা যায়। যথা– সৃষ্ট, শ্রীকণ্ঠ, মেধ, কীর্তি, নিবৃত্তি, ব্রহ্মা, বামাদ্যজ, সারস্বত, অমৃত, হর, নরকারি, ললাট, একমাত্রিক, কণ্ঠ, ব্রাহ্মণ, বাগীশ, প্রণবাদ্য। অ-উ-ম, এই তিন বীজবর্ণে প্রণবের উৎপত্তি। যোগ সাধনের এখানে একটি গূঢ় সন্ধান আছে। যোগীরা বলেন, মন একাগ্র করতে হলে প্রথমাবস্থায় একেবারে, সমস্ত ওঙ্কার উচ্চারণ করবে না। আগে ওঙ্কারের আদ্যক্ষর কেবল অকার জপ করা চাই। নিয়ম হচ্ছে– পদ্মাসন বন্ধন করে উন্নতভাবে বসে মস্তক সম্মুখে বক্র করবে এবং বক্ষের উপর চিবুক লাগাবে। পরে, কণ্ঠের নিম্ন হতে প্লুত অনুদাত্ত স্বরে অকার উচ্চারণ করতে থাকবে। ক্রমে তরঙ্গের ন্যায় বক্র করে অল্পে অল্পে সুর উর্ধে তুলবে এবং প্লুত উদাত্ত স্বরে অকারের উচ্চারণ করবে। পরিশেষে, ক্রমশঃ আবার সুর নামিয়ে প্লুত স্বরিত স্বরে অকার উচ্চারণ করবে। এইরূপ নীচ সুরের অকার হতে অল্পে অল্পে সুর উপরে তুলতে গেলে উকার নিজেই আসে। পরে উপর হতে সুর নামানোর সময় স্বরপতন কালে অনুনাসিক অকার নিজেই এসে পড়ে। প্রয়োগ: ১ ব্রহ্ম – অঃকার কেবল ব্রহ্ম একাক্ষরকোষে। অঃ কী কর, অঃ-স্বরূপা রাখ মোরে তোষে॥ – অন্নদামঙ্গল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, ১৬০০।
- অ৩– অব্যয়, ১ সাদৃশ্য অর্থে–অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ-সদৃশ; ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য)। সমমব্রাহ্মণে দানম্– মনু সংহিতা ৭.৮৫। ২ অভাবার্থে– অভাব; অবিদ্যমানতা। “অঘট (ঘটাভাব), অক্রোধ, অলোভ, অহিংসা, অকর্মক” ইত্যাদি। “অবানরা অরামা করিব ধরাতল”–কৃত্তিবাসী রামায়ণ। “অচক্ষু সর্ব্বত্র চান,”–অন্নদামঙ্গল। “অগতির গতি”–ব্রহ্মসঙ্গীত। অবস্তু (no-thing); অনঙ্গ [অ (অন্) + অঙ্গ (অ স্বরবর্ণের পূর্বে থাকলে ‘অ’ স্থানে ‘অন্’ হয়)]। ন পাপং অপাপং। ৩ অন্যত্ব অর্থে– অন্যত্ব; ভেদ; পৃথগ্ভাব। অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্যজাতি)। “কহিলেন-অ- ব্রাহ্মণ নহ তুমি, তাত! তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত!”–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অঘট– ন ঘটঃ অঘটঃ, ঘট ভিন্ন অন্য পদার্থ। অকুপ্য ইত্যাদি। অতৈজসানি পাত্রাণি– মনুসংহিতা ৬.৫৩। ৪ অল্পতা অর্থে–অল্পতা, ঈষদর্থ, তুচ্ছতা। “অবোধ (অল্পবুদ্ধি); অনায়াস (অল্প আয়াস); অনুদরী (অল্পোদরী, কৃশোদরী বা মন্দোদরী) কন্যা; অজলা (অল্পজলা) নদী; অকেশী (অল্পকেশী) কন্যা; অবস্তু” ইত্যাদি। ৫ অপ্রশস্ততা অর্থে– অপ্রাশস্ত্য, অবৈধতা। অকাল– ন কালঃ অকালঃ অর্থাৎ অপ্রশস্ত কাল। অপ্রশস্ত, অবৈধ, অশুভ, অপরিণত, অযথা, অযোগ্য ইত্যাদি বোধক– অকালবোধন; অকার্য; অক্ষত্রিয় আচরণ; অলক্ষণ; অসময় ইত্যাদি। ৬ বিরোধ অর্থে– বিরোধ; প্রতিকূলতা। অনৈসলামী (ইসলামবিরোধী); অসুর (সুরবিরোধী); অহিন্দু আচরণ (হিন্দু-বিরোধী আচরণ); অশাস্ত্রীয় (শাস্ত্র-বিরোধী); অলক্ষ্মী; অজ্ঞান ইত্যাদি। “তৎসাদৃশ্যমভাবশ্চ তদন্যত্বং তদল্পতা। অপ্রাশস্ত্যং বিরোধশ্চ নঞর্থাঃ ষট্ প্রকীর্ত্তিতাঃ॥ ৭ অধিক্ষেপার্থে– আক্রোশ, অধিক্ষেপ। “অজীবনি” ইত্যাদি। পাণিনি ৩.৩.১১২। ৮ অনর্থকার্থে– (বাংলায়) নিষেধবাচক নয় এমন অনর্থক। “অবৃথা (অর্থাৎ বৃথা); অব্রেথা; অমন্দ; অলোপ; অশঙ্কেত (সঙ্কেত–শ্রীকৃষ্ণকীর্তন)। “শিরোমণি মহাশয়কে আমি কি অতুচ্ছ কত্তে পারি?”– লীলাবতী, ৩৭। “কেন, কলু অমন্দ জাত্টা কী?” অমৃত গ্রন্থাবলী ১২৪। আমাতে অচাষা পেয়েছ কিনা (মালদহ)। একথা যদি অব্রেথা হয়, তা হ’লে দশ ঘা জুতো খাব। বাস্তবিক বিপরীত অর্থে (অর্থাৎ বৃথা মন্দ ইত্যাদি অর্থে) ঐ সকল শব্দ প্রয়োগ করে অশিক্ষিতে সেই অর্থ ঠিক রেখে বাক্য শেষ করতে পারে না, ফলে বিপরীতার্থকই হয়ে যায়। বোধ হয়, এটা ঐরূপ অ-কারের মূল। ব্যুৎপত্তি: ন (নঞ্) > অ, অন্; নঞ্ তৎপুরুষ সমাসে নকারের লোপ হলে অকার থাকে। নলোপো নঞঃ। পাণিনি ৬.৩.৭৩। অ স্বরবর্ণের পূর্বে থাকলে ‘অ’ স্থানে ‘অন্’ হয়। ন পাপং অপাপং। দেখুন ‘অন্’১ ‘ন’৩। বাংলার এই নঞ্অর্থক উপসর্গ = ইংরেজি নঞ্ অর্থক উপপদ (prefix) a, ib, im, in, no, non, ir, un ইত্যাদির তুল্য। ইংরেজি un, on = আইসল্যান্ডি o (অ) = সুইডিশ o = ডেনিশ u. সংস্কৃতমূলক ভারতীয়, সিংহলী, ব্রহ্ম ইত্যাদি যাবতীয় ভাষার আদ্যক্ষরের উচ্চারণ বাংলা ‘অ’ এবং লঘু আকারযুক্ত হিন্দি ‘অ’র তুল্য। ফিনিক্, হিব্রু, তুর্কী, আরবী, ফার্সী ইত্যাদি সেমেটিক ভাষাগুলির আদ্যক্ষরের উচ্চারণ ‘আলিফ্’ (ا) এবং য়ুরোপীয় বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’ (A, a); গ্রীক ‘অ্যাল্ফা’ (Α, α)। অ নঞ্ তৎপুরুষ সমাসযুক্ত হয়ে অভাব, অল্পতা, অপ্রশস্ততা, অন্যত্ব, সাদৃশ্য ও বিরোধ–এই ৮ প্রকার অর্থ জ্ঞাপন করে। সাধারণতঃ নিষেধবাচক এই অর্থে অ অন্য শব্দের সংযোগ ব্যতীত প্রযুক্ত হয় না।
- অ৪– অব্যয়, ১ অনুকম্পা। ২ অধিক্ষেপ; নিন্দা; তিরস্কার। [অধিক্ষেপে (তিরস্কারে) ক্রিয়াপদ পরে থাকলে নঞের স্থানে অ হয়।] ৩ সম্বোধন। ৪ (প্রাচীন বাংলায়) বিষাদ; শোক। জ্ঞাতব্য: অ অনন্ত, এখানে পূর্বে অকার এবং পরপদের আদিতে অকার আছে, কিন্তু এক স্বরের সঙ্গে সন্ধি হল না। নিপাত একাজনাঙ্। পাণিনি ১.১.১৪। আ ভিন্ন অন্য যে নিপাত একাচ্ তা প্রগৃহ্য সংজ্ঞক হবে, সুতরাং সন্ধি হবে না। বাংলা ভাষায় এইরূপ স্থলে ও, উঃ, এবং আঃ প্রচলিত। ও মূর্খ! তুমি কিছুই জান না? উঃ! কী মনস্তাপ? আঃ! কষ্টের রাত্রি পোহায় না। প্রয়োগ: অব্যয়, ১ বিষাদ; শোক – অ প্রাণ ধারণ না জাএ সুন্দরি রাধে। – শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। ২ সম্বোধন – অ মোর সোণার সুত – চৈতন্য মঙ্গল। ৩ সম্বোধন – অ মোর রসনা – ভক্তমালগ্রন্থ। ৪ সম্বোধন – অ! অনন্ত আগচ্ছ ভোঃ।। ১ অধিক্ষেপ; নিন্দা – নঞো নলোপস্তিঙি ক্ষেপে। অ পচসি ত্বং জাল্ম। – কাশিকা বৃত্তি।
- অ৫– সর্বনাম, এই; এ। প্রয়োগ: ১ এই – অ-কারণে (এই কারণে); অক ছাড়িয়া (এ স্থান ছেড়ে)ত কহত অখন – বঙ্গসাহিত্য-পরিচয়। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অসৌ > প্রাকৃত অহ > বাংলা অ, হিন্দি যহ; এ৩ দেখুন; অপ্রচলিত।
- অ৬– কারক বিভক্তি: অধিকরণে সপ্তমি বিভক্তি। প্রয়োগ: ১ আড়াঅ বাঘর ভঅ জলত কম্ভীর – শূন্যপুরাণ। ব্যুৎপত্তি: সপ্তমী বিভক্তি ‘য়’৬ > অ; অপ্রচলিত।
- অ৭– ক্রিয়া বিভক্তি: সংস্কৃত তে > প্রাচীন এ > বাংলায় (য়ে > য়) অ; অপ্রচলিত। – বর্তমান কালে প্রথম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। চর্যাপদ– “ডমরুলি বাজঅ (অর্থাৎ বাজয়ে) ৪৮; জাঅ; জুঝঅ; বুঝঅ ৫১। কৃত্তিবাসি রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড– রাজা কঅ : না লঅ তোমার মন ১; সব নষ্ট হঅ ৫; লজ্জা হঅ : মনে লঅ ৮; জাঅ প্রজাগণ ১৩; ধাঅ ১৮; চালাঅ সারথি ২০; দেখাঅ ২৭। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড– পলাঅ ১৮; দেঅ ৫৪। শূণ্যপুরাণ– জেবা বাতি জলে হঅ ১১৪; লোটাইয়া জাঅ ১১৫। বিদ্যাপতি– তনু দেঅ চান ২২১। সংস্কৃত (লট্) থ > প্রাকৃত হ > বাংলা অ– বর্তমান কালে মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার সম্ভ্রমসূচক বিভক্তি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন– “হঅ গরুর রাখোআল, বোল আকশ পাতাল ১০৭। গোরক্ষবিজয়– না বুঝ দশের বোল ৮৯; আর কি পাইতে আস ১৬০। মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা– মম মঙ্গল বাঞ্ছ যদি বিদায় দেহি মোরে ১২২। কৃত্তিবাসী রামায়ণ– হিংসা কর ৫। [বোল– ✔বোল+অ; এইরূপ ‘বুঝ’ ‘আস’ প্রভৃতি। সংস্কৃত (লোট্) ত, (বৈদিক) থ > প্রাকৃত হ (তুলনামূলক ‘পণমহ, সংস্কৃত প্রণমত।–বাংলা উত্তরহ) > বাংলা অ (সম্ভ্রমে)–হসত > হসহ > হাস (সম্ভ্রমে); সংস্কৃত হস (লোট্–হি) > প্রাকৃত হস > বাংলা হাস্ (অ-লোপ, অসম্ভ্রমে)।– অনুজ্ঞায় মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। মীনচেতন– (সম্ভ্রমে) “ভুঞ্জঅ কদলীদেশ ৫; জাঅ পলাইয়া ১৩; খাঅ ১৯। গোরক্ষবিজয় চাঅ ৬৫; তত্ত্বে দেঅ মন ১৩৬। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড– রাজ উপরে হঅ ৯; বেড়াঅ তুমি ১৩। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন– লঅ ভার কাহ্ন ১৭৪। মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা– অপমান ত্যাগ (অর্থাৎ ত্যাগ কর) বাপু ১২২। মনসামঙ্গল– (অসম্ভ্রমে) লোহা তাতাইয়া কামারগণ করে গণ্ডগোল। কেহ বলে ‘তাতা’ (✔তাতা+অ–তপ্ত কর্) কেহ বলে ‘তোল’॥ ১৬৮। অঁ > অ, দেখুন ওঁ৩– কর্তৃবাচ্যে বর্তমান কালে উত্তম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। শিবায়ন– “বৈষ্ণব বন্দ (অর্থাৎ বন্দনা করি) : ঋষি বন্দ : দেব বন্দ : তীর্থ বন্দ ইত্যাদি ৪.৫।
- অ৮– বিশেষ্য, [পরিভাষা (বিজ্ঞান)] অক্ষিজন (অ১ অ২ ইত্যাদি)। ব্যুৎপত্তি: ইংরেজি O– Oxygen-এর সংক্ষেপণের অনুকরণে।
- অ৯– সর্বনাম, অই; ঐ; এই; সেই। প্রয়োগ: সর্বনাম, ১ এই; সেই – সরিষার রূপ হয়য়া দুবায় লুকাইল। অ কারণে খেতু কান্দিবার লাগিল। – মাণিকচন্দ্র রাজার গান। ব্যুৎপত্তি: প্রাচীন বাংলা। অই সংক্ষেপে ও প্রাদেশিক উচ্চারণে। তুলনামূলখ তে (তে কারণ); তুলনামূলক ই
- অ৽– বিশেষ্য, অম্লজানের সাঙ্কেতিক চিহ্ন।
- অই১– বিশেষণ, ১ সম্মুখস্থ; পুরোবর্তী; দূরস্থ; নাতিদূরস্থ। ২ বুদ্ধিস্থ; মনস্থিত। ৩ সেই; তাহা; পূর্বোক্ত; তাদৃশ। ৪ [হিন্দি ৱহ] সেই, তদভিন্ন (That very)।। সর্বনাম, ১ সম্মুখে দূরস্থ বা নাতিদূরস্থ নয়নগোচর বিয়ষ– মনুষ্যাদি; ঐ; ও; ওই। ২ বুদ্ধিস্থ বিষয়-নির্দেশ; উহা; সে; সেই; তাহা (তা)।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ সম্মুখে; দূরে; নাতিদূরে; পুরোভাগে। ২ দূরশ্রুত ধ্বনির নির্দেশ। ৩ দূরস্থ দৃশ্যনির্দেশ।। অব্যয়, ১ বিস্মৃত বিষয়ের হঠাৎ স্মরণে। ২ রোষে। ৩ পুরোভাগে; ইন্দ্রিয় গোচরে; সম্মুখে। ৪ ওখানে; যথায় বিরাজ করছে ঠিক সেই স্থানে। ৫ অদূরে। ৬ দূরে। ৭ অনন্য; নির্দিষ্ট। ৮ উক্ত; উল্লিখিত। ৯ স্মরণ সূচক। ১০ দোষ বা ভয় প্রর্দশন সূচক। উচ্চারণ সাদৃশ্য হেতু ‘অই’ স্থলে পদ্যে ‘ওই’ সংক্ষেপে ‘ও’ এবং ‘ঐ; [ঐ, ও, ওই দ্রষ্টব্য] ব্রজবুলি, প্রাচীন বৈষ্ণব-সাহিত্য, ‘অই’ স্থলেও ‘ও’ এবং ‘উহ’। “উহ রসময়ী ইহ রসিক-শিরোমণি,”–জ্ঞানদাস। “ও নব জলধর অঙ্গ। ইহথির বিজুরী তরঙ্গ।”–গোবিন্দ দাস। প্রয়োগ: বিশেষণ, ১ সকল অর্পিনু মুঞি অই শ্রীচরণে ভক্তমালগ্রন্থ। অই ঠাকুরের কেশ শোভে নানা ফুলে॥ – চৈতন্যভাগবত। ২ সম্মুখস্থ – রাম কৃষ্ণ দুই ভাই ক্ষুধায় আকুল। ধেনু চরায়ে অই কাননে অদূর॥ – শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল। ৩ সেই; তাহা; পূর্বোক্ত; তাদৃশ – আট দিগে ভাল বর চাহে লক্ষপতি। অবিরত অই চিন্তা স্থির নহে মতি॥ – কবিকঙ্কন চণ্ডী। ৪ সেই; তাহা; পূর্বোক্ত; তাদৃশ – উহারি হাতে রাঙ্গা শাঁখা অই বরণে গোরী – কবিকঙ্কন চণ্ডী। ৫ সেই; তাহা; পূর্বোক্ত; তাদৃশ – চাঁপায়ে প্রভুর আজ্ঞা সদা মনে অই। – শ্রীধর্ম্মমঙ্গল।। সর্বনাম, ১ ওই – অই কি জানে স্ত্রী কলা – কবিকঙ্কণ চণ্ডী। ২ তা; সেই – অই জিয়া থাক সই – কবিকঙ্কণ। ৩ নাতিদূরে – দুর্জয় গড় অই। বকুল তলায় বসিয়া অই। কালিকা আকাশে অই। – ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। ৪ সম্মুখে – অই দেখ গান করে নারী পতিহীনা : অই দেখ নৃত্য করে হাতে অস্ত্র ধরি। – মহাভারত, কাশীদাস। ৫ সেই – অভাগীর ভাড়া অই : অন্ধার মাণিক অই। – শ্রীধর্ম্মমঙ্গল।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ ওই – নিশি অন্ত জেনে ডাকিছে অই কোকিলে। – রামনিধি দত্ত। ২ দূরবর্তী – অই কুহরিল পিক ললিত উচ্ছ্বাসে। – হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩ দূরশ্রুত – অই শুন অই শুন ভেরীর আওয়াজ। – রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪ দূরস্থ দৃশ্যনির্দেশ – অই যে অবনীতলে, পরশমাণিক জ্বলে, বিধাতা-নির্ম্মিত চারু মানব-নয়ন। – হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ দূরে – শারি কহে কই তব তমালিকা কই। শুক বলে অই দেখ ডালে বসে অই॥ – বাসবদত্তা।। অব্যয়, ১ ওখানে – অই শশী অই খানে, এই স্থানে দুইজনে – হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ২ বিস্মৃতি স্মরণ – অই যা, তাড়াতাড়িতে সব ভুলেছি। ৩ রোষে; রাগে – অই! আবার সেই কথা, মারব! ৪ সম্মুখে – অই যে জগৎ জাগে, স্বদেশ অনুরাগে। – বিশারদ।। ১ ওই – কে রমনী অই পথে পথে গাই – হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ২ ওই – ভারতের “গ্রীন্-উইচ্” অই আগেরকার ৩ বুদ্ধিস্থ; মনস্থিত – ভগবান্ নিত্য যেন তেন অই শক্তি – দুর্গাপঞ্চরাত্রি, কাশীবিলাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪ বুদ্ধিস্থ; মনস্থিত – অই মম তপ, অই মম জপ – স্বপ্নপ্রয়াণ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত, অদস্ প্রথমা, বহু বচন–অমী = প্রাকৃত, অঈ; বৌদ্ধ বাংলায় অই (চর্যাপদ ২৬.২) = আধুনিক বাংলা অই (পদ্যে ও সঙ্গীতে) = ঐ (গদ্যে এবং ছন্দার্থে পদ্যে)। – বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস। সংস্কৃত অসৌ > প্রাকৃত অহ (হে), অপভ্রংশ প্রাকৃত–ওই (প্রথমা বহুবচন), > বাংলা (ই-আগমে ‘অহি’) অই; হিন্দি ৱহ; মৈথিলি ওহি; আই–এই (চ)। – বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
- অই২– ক্রিয়া-বিভক্তি: কর্তৃবাচ্যে বর্তমান কালে প্রথম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত (আগম) অ + তি (লট্) > প্রাকৃত অ + ই = অই, যেমন সংস্কৃত ভৱতি > প্রাকৃত হৱই (সিদ্ধহেমচন্দ্র, শঙ্কর পাণ্ডুরঙ্গ পণ্ডিত সম্পাদিত); অপ্রচলিত। প্রয়োগ: ১ অগ্নিরে দহিলে পিণ্ড হুবই যে ধূলি; দেবী কি শীতল ভোগ দিঅই বহুত : গুরুর আজ্ঞএ মোক্ষ হুঅই পিণ্ডকু। – বঙ্গসাহিত্য-পরিচয়।
- অইছে১– ক্রিয়াবিশেষণ, ঐরূপে; ঐভাবে; ওইভাবে। ব্যুৎপত্তি: অইসে ( স = ছ), তুলনামূলক হিন্দি এয়সে।
- অইছে২– ক্রিয়া, হয়েছে; হইয়াছে। ব্যুৎপত্তি: হইয়াছে > হয়েছে > অইছে (হ = অ)।
- অইছন– বিশেষণ, সেইরূপ; সেইরকম; এইভাবে, সেইভাবে, সেইরূপে; ঈদৃশ; এতাদৃশ।। ক্রিয়াবিশেষণ, এইভাবে; সেইভাবে; সেইরূপে; ঐসম; ঐপ্রকার; এমন; এরূপ। ব্যুৎপত্তি: অই১+সন (সম), বৈষ্ণব-সাহিত্যে; সংস্কৃত ঈদৃশ >; অতি প্রাচীন বাংলা আইস, “আইস ভাবে; আইস সংবোহেঁ কো পতিআই” চর্যাপদ ২৯.১) আইসো। ঐছন দ্রষ্টব্য। প্রয়োগ: বিশেষণ, ১ তদ্রূপ – অইস সহাব। – চর্যাপদ; দোহাকোষ।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ ঐভাবে। – অইসন কএ বোল দহু, নিঅ সীম তেজি কহু, উছলু পয়োনিধি নীরে। – বিদ্যাপতি।
- অইন১– বিশেষ্য, ছোট গাছ।
- অইন২– ওয়াইন; মদ বিশেষ। ব্যুৎপত্তি: ইংরেজি wine
- অইমনি– ক্রিয়াবিশেষণ, তৎক্ষণাৎ; তখনি। ব্যুৎপত্তি: অমনি > অইমনি; অপ্রচলিত। প্রয়োগ: ১ তৎক্ষণাৎ – এত বলি বৈষ্ণবের পাদোদক আনি। বালকের মুখে দিতে বাঁচিল অইমনি॥ – ভক্তমালগ্রন্থ।
- অইল১– বিশেষ্য, অম্লকূচির গাছ; এর কষ লাগিয়ে চামড়া নরম, পরিস্কার ও রং করা (Tan) হয়।
- অইল২– বিশেষ্য, চালের ছাঁইচ। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ৱলীক, “ৱলীক নীধ্রে পটল-প্রান্তে,”–অমরকোষ।
- অইল৩– ক্রিয়া, হইল। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত হইল > অইল।
- অইলতলা– বিশেষ্য, ছাঁচতলা; ওলতলা। ব্যুৎপত্তি: অইল২ + তলা।
- অইস– বিশেষণ, ১ সেইরূপ; সেইরকম। ২ এইভাবে, সেইভাবে, সেইরূপে। ৩ ঈদৃশ; এতাদৃশ।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ এইভাবে; সেইভাবে; সেইরূপে। ২ ঐসম; ঐপ্রকার; এমন; এরূপ। ব্যুৎপত্তি: অই১+সন (সম), বৈষ্ণব-সাহিত্যে এবং সংস্কৃত ঈদৃশ >; অতি প্রাচীন বাংলা আইস, “আইস ভাবে; আইস সংবোহেঁ কো পতিআই” চর্যাপদ ২৯। ১) আইসো। ঐছন দ্রষ্টব্য। ব্রজবুলি। প্রয়োগ: ক্রিয়াবিশেষণ, ১ এভাবে – অইসন কএ বোল দহু, নিঅ সীম তেজি কহু, উছলু পয়োনিধি নীরে। – বিদ্যাপতি।। ১ অইস সহাব – চর্যাপদ; দোহাকোষ।
- অইসিসি– ক্রিয়া, আসিস। –চর্যাপদ ১০। ৪। ব্যুৎপত্তি: প্রাচীন বাংলা আস।
- অইসে– বিশেষণ, ১ সেইরূপ; সেইরকম। ২ এইভাবে, সেইভাবে, সেইরূপে।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ এইভাবে; সেইভাবে; সেইরূপে। ২ ঐসম; ঐপ্রকার; এমন; এরূপ। ব্যুৎপত্তি: অই১+সন (সম), বৈষ্ণব-সাহিত্যে এবং সংস্কৃত ঈদৃশ >; অতি প্রাচীন বাংলা আইস, “আইস ভাবে; আইস সংবোহেঁ কো পতিআই” চর্যাপদ ২৯। ১) আইসো। ঐছন দ্রষ্টব্য।
- অইসেঁ– বিশেষণ, ১ সেইরূপ; সেইরকম। ২ এইভাবে, সেইভাবে, সেইরূপে। ৩ ঈদৃশ; এতাদৃশ।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ এইভাবে; সেইভাবে; সেইরূপে। ২ ঐসম; ঐপ্রকার; এমন; এরূপ। ব্যুৎপত্তি: অই১+সন (সম), বৈষ্ণব-সাহিত্যে এবং সংস্কৃত ঈদৃশ >; অতি প্রাচীন বাংলা আইস, “আইস ভাবে; আইস সংবোহেঁ কো পতিআই” চর্যাপদ ২৯। ১) আইসো।
- অইসো– এইভাবে; সেইভাবে; সেইরূপে। বিশেষণ, ১ সেইরূপ; সেইরকম। ২ এইভাবে, সেইভাবে, সেইরূপে। ৩ ঈদৃশ; এতাদৃশ।। ক্রিয়াবিশেষণ, ঐসম; ঐপ্রকার; এমন; এরূপ। ব্যুৎপত্তি: অই১+সন (সম), বৈষ্ণব-সাহিত্যে এবং সংস্কৃত ঈদৃশ >; অতি প্রাচীন বাংলা আইস, “আইস ভাবে; আইস সংবোহেঁ কো পতিআই” চর্যাপদ ২৯। ১) আইসো।
- অইসন– বিশেষণ, ১ সেইরূপ; সেইরকম। ২ এইভাবে, সেইভাবে, সেইরূপে। ৩ ঈদৃশ; এতাদৃশ।। ক্রিয়াবিশেষণ, ১ এইভাবে; সেইভাবে; সেইরূপে। ২ ঐসম; ঐপ্রকার; এমন; এরূপ। ব্যুৎপত্তি: অই১+সন (সম), বৈষ্ণব-সাহিত্যে এবং সংস্কৃত ঈদৃশ >; অতি প্রাচীন বাংলা আইস, “আইস ভাবে; আইস সংবোহেঁ কো পতিআই” চর্যাপদ ২৯। ১) আইসো। ঐছন দ্রষ্টব্য। প্রয়োগ: ১ এইভাবে – অইসন কএ বোল দহু, নিঅ সীম তেজি কহু, উছলু পয়োনিধি নীরে। – বিদ্যাপতি।
- অউনিঞা– বিশেষ্য, অগ্রগামী সৈন্য।। আগু-অনীক (অগ্রানীক) মূল; অপ্রচলিত। প্রয়োগ: ১ অগ্রগামী – অউনিঞা পাইক। – রামায়ণ, কৃত্তিবাস।
- অউষধ– বিশেষ্য, ঔষধ। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ঔষধ, ঔ > অউ, দ্র ‘ঔ’; পদ্যে; অপ্রচলিত। প্রয়োগ: বিশেষ্য, ১ ঔষধ। – সকল রোগের অউষধ আছে, হয়্যো না উতলা। – স্বপ্নপ্রয়াণ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
- অঋণ– বিশেষ্য, ঋণাভাব।। বিশেষণ, অঋণী; ঋণমুক্ত; দেনামুক্ত। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অ + ঋণ।
- অঋণী– যিনি ঋণী নন; যার ঋণ নেই। বিশেষণ, ১ ঋণী নয় এমন; ঋণমুক্ত; ঋণশূন্য; যার ধার কর্জ নেই; দেনাশূন্য, কারও কাছে কিছু ধারে না এমন; যে কারও কিছু ধার করে নি; যার উপস্থিত ঋণ নেই; ঋণমুক্ত; যে ঋণ পরিশোধ করেছে। ২ দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণ নামক ঋণত্রয় হইতে যাগ, যজ্ঞ, দান ও সন্তানোৎপাদনদ্বারা মুক্ত। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত; মূলশব্দ–অঋণিন্। অ (না, নহে) + ঋণিন্ (ঋণগ্রস্ত); ন ঋণ-ইন্ অস্ত্যর্থে। নঞ্ তৎপুরুষ। ঋকারের ‘রি’ উচ্চারণের কারণে নঞ্ স্থানে অ (অ৩; ঋ১)। কোন কোন সংস্কৃত গ্রন্থে এই রূপ গৃহীত হয়েছে। যথা– অঋণী চাপ্ররাসী চ স বারিচর মোদতে। (মহাভারত বনপর্ব)। নঞ্ তৎপুরুষ সমাসে স্বর বর্ণ পরে থাকলে অ স্থানে অন হয়। ঋকারের হলত্বগ্রহণ শুদ্ধ নয়। ঋকার অর্ধ স্বরবর্ণ; অর্থাৎ এর আদিতে অর্ধেক স্বর এবং অন্তে অর্ধেক হল (অ্+র্) মিশ্রিত আছে। তজ্জন্য ‘অনৃণী’ সিদ্ধরূপ। কালিদাস এই বিশুদ্ধরূপ গ্রহণ করেছেন। যথা– তদহমেনাম্ অনৃণাং করোমি। কিন্তু আধুনিক বাংলায় অঋণী রূপই বহুল প্রচলিত। প্রয়োগ: বিশেষণ, ১ ঋণমুক্ত – অঋণী চাপ্রবাসী চ স বারিচর মোদতে – মহাভারত। ২ ঋণশূন্য – অঋণী হইব আমি তোমার বচনে – শিবায়ন।
- অএ– অব্যয়, ১ সম্বোধন। ২ সগৌরব সম্বোধন। ৩ নিন্দাসূচক সম্বোধন। ৪ সরোষ সম্বোধন। ৫ সবিষাদ বা কাতর সম্বোধন। ৬ সস্নেহ সম্বোধন।। সপ্রণয় সম্বোধন। ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত অয়ে; য়ে > এ (উচ্চারণে)। প্রয়োগ: অব্যয়, ১ নিন্দাসূচক সম্বোধন – শুন শুন অএ মূঢ় চিত্ত। – মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা। ২ সগৌরব সম্বোধন – শুন গুরু মিননাথ, অএ বাপু কর অবধান। – মীনচেতন। ৩ সগৌরব সম্বোধন – কহ কহ অএ সূত পূর্ব্ব বিবরণ। – গঙ্গামঙ্গল। ৪ সপ্রণয় সম্বোধন – শুন শুন অএ সখা শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল। শুন অএ প্রিয়া। উফায় চিন্তএ অএ কান্ত। – মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা। ৫ সবিষাদ বা কাতর সম্বোধন – অএ প্রভু ত্রিবিক্রম ... অপরাধ ক্ষেম : অএ ঠাকুর লাগহু চরণ। – গঙ্গামঙ্গল। ৬ সবিষাদ বা কাতর সম্বোধন – অএ রাজা কেহ্নে ক্রোধ কর কিঙ্করের। – মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা। ৭ সম্বোধন – অএ কর্ণধার – মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা। ৮ সরোষ সম্বোধন – বোল দেখি অএ মূঢ় মমাধিক হএ কোন জন। – মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা। ৯ সরোষ সম্বোধন – অএ অএ নিন্দিত ব্রাহ্মণ দুরাচার। – চৈতন্যচন্দ্রোদয়। ১০ সস্নেহ সম্বোধন – দেবী বরেন শুন পুত্ত্র অএ বীরবর। – মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা। ১১ সস্নেহ সম্বোধন – শুন শুন অএ পুত্ত্র তুমি সর্ব্বধন। – শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল।
- অও– অব্যয়, এবং; আর; ও; এবং; অথবা।নতুন ভাষা শিখুন ব্যুৎপত্তি: আরবি আউ ( او ) প্রাচীন বাংলায় = অও; তুলনামূলক হিন্দি