অ১

  • প্রমিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • দেশী
  • বাংলা
  • অ

অকার; বাংলা বর্ণমালার আদ্যবর্ণ; আলিকালির আদ্য অক্ষর; আদ্য স্বর। পূর্বে চলিত বাঙলায় স্বরবর্ণকে ‘সিদ্ধি’ বলা হত, তার কারণ এই, প্রাচীন বৈয়াকরণেরা বর্ণমালার প্রথমেই সমস্ত স্বরবর্ণকে লিখেছেন এবং এদেশের প্রথানুসারে তাঁরা গ্রন্থারম্ভে ‘সিদ্ধিরস্তু’ (সিদ্ধি হউক) বলে মঙ্গলাচরণ করতেন। প্রথমে মঙ্গলাচরণ, তার পরে স্বরবর্ণ; এজন্য মঙ্গলাচরণের আদিশব্দ ‘সিদ্ধি’ হতে স্বরবর্ণের নাম ‘সিদ্ধি’ হয়েছে।

উচ্চারণ

উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ, তাই কণ্ঠ্যবর্ণ; কিন্তু সংস্কৃতের ন্যায় বাংলার আ-কার দীর্ঘ নয়; অ-কারের ন্যায় হ্রস। সুতরাং কেবল আকৃতিতে বাংলায় অ-কার ও আ-কার, সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে চার প্রকার– (১) লঘু স্পৃষ্ট (অর্থ, অদ্বৈত ইত্যাদির অ); (২) স্পষ্ট (অতল, অজ, অন্যায় ইত্যাদির অ); (৩) লঘু বা অর্ধব্যক্ত ওকারের মত (কলিকা, রজনী, ললিত ইত্যাদির ক্, জ্, ল্ সংযুক্ত অ = অ̑, ক̑, জ̑, ল̑); (৪) পূর্ণব্যক্ত ওকারবৎ (অতিশয়, অনুরোধ ইত্যাদির অ বা মন, যদু ইত্যাদির ম্, য্ সংযুক্ত অ = ‘ওতিশয়’, ‘ওনুরোধ’, ‘মোন’ এবং ‘যোদু’)।

পাণিনি সংবৃত-বিবৃত-ভেদে দুই প্রকার অকারের উল্লেখ করেছেন; সংবৃত অকারের উচ্চারণে গলনালীর সঙ্কোচ এবং বিবৃত অকারের উচ্চারণে গলনালীর বিবার অর্থাৎ প্রসারণ করতে হয়। অকার উচ্চারণে সংবৃত কিন্তু সন্ধিপ্রভৃতি প্রক্রিয়ায় বিবৃত (পাণিনি ১.১.৯)। একমাত্রাবিশিষ্ট বা হ্রস্ব অকারের দ্বিমাত্র বা দীর্ঘ উচ্চারণে আকার এবং ত্রিমাত্র বা প্লুত উচ্চারণে প্লুত অ৩-কার হয়। এরূপ মাত্রাভেদ থাকলেও এই ত্রিবিধ অকার সবর্ণ।

সংস্কৃতে অ’র উচ্চারণ সাধারণতঃ হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত এবং উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত। সংস্কৃত ব্যাকরণমতে উচ্চারণভেদে অকার আঠার প্রকার– হ্রস্ব উদাত্ত, হ্রস্ব অনুদাত্ত ও হ্রস্ব স্বরিত; দীর্ঘ উদাত্ত, দীর্ঘ অনুদাত্ত ও দীর্ঘ স্বরিত; প্লুত উদাত্ত, প্লুত অনুদাত্ত, ও প্লুত স্বরিত। পুনরায় এই নয় প্রকারের অনুনাসিক ও অননুনাসিক ভেদে সর্বসমেত আঠার প্রকার। সংস্কৃত গুরুর মুখে না শুনে এই সকল উচ্চারণ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়।

সংস্কৃতের অন্যস্বরও হ্রস, দীর্ঘ, প্লুত উচ্চারিত হয়; কিন্তু বাংলায় দীর্ঘ স্বরও হ্রস স্বরের ন্যায় উচ্চারিত হয় তাই বাংলায় অ-ত্রয়ের ন্যায় অন্য হ্রস্ব দীর্ঘ স্বরেরও উচ্চারণগত প্রভেদ সামান্য। হিন্দি, মরাঠী প্রভৃতি ভাষার অ-কার ঈষদ্-বিবৃত, অর্থাৎ আ-কার ঘেঁষা। প্রাচীন বাংলায় চর্যাপদে ‘আঙ্গন’ ‘আন্তে’ (অন্তে) ইত্যাদির ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ‘আচেতন’ ‘আর্জ্জন’ ‘আণেক’ প্রভৃতি শব্দের আ-কার ঐরূপ উচ্চারণমূলক।

আধুনিক বাংলায় ‘আগণা’ ‘আচষা’ ‘আতেলা’ ‘আলুণি’ প্রভৃতির আ-কার ঐরূপেই হয়েছে। সংস্কৃতের ‘শ্বাপদ’ ‘বিশ্বামিত্র’ প্রভৃতির এবং প্রাকৃতের ‘মাণংসী’ (মনস্বী) ‘পারোহ’ (প্ররোহ) ইত্যাদির আ-কার ঐরূপে দীর্ঘ। এতদ্ভিন্ন বাংলায় অ-কারের ও-কারবৎ উচ্চারণ আছে; যেমন– ‘অনুচর’ ‘অমনি’ ‘রসুই’ ‘লক্ষণ’ ইত্যাদি।  কেবল হ্রস ও দীর্ঘস্বর গৃহিত হয়েছে।

ব্রজবুলি এবং হিন্দিতে ঈষৎ স্পৃষ্ট বা লঘু আকারের ন্যায় উচ্চারিত, তাই ‘অতি’ অনেকটা ‘আতি’র মত। প্রাচীন বাংলা ‘অতি’ স্থলে ‘আতি’র প্রয়োগও দৃষ্ট হয়। আধুনিক শুদ্ধ উচ্চারণ ‘ওতি’। ‘অজ’র ‘অ’ উচ্চারণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণগুলির অকারান্ত উচ্চারণ বাঙলা ভাষারই বিশেষত্ব।

সাধারণত অ পরে অকার বা আকারযুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে অকারের উচ্চারণ বজায় থাকে (অজ, অজা); ি, ী, ু, ূ, যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে ওকারবৎ (অতি, অতীত, অরুণ) এবং পরে ো থাকলে অ (অতো, অহো)।

সংস্কৃত ও সংস্কৃতমূলক যাবতীয় ভাষায় হল্‌বর্ণ অকারের আশ্রয়ে উচ্চারিত হয়। তাই, অ-কার ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত হলে অন্যান্য স্বর রূপান্তর প্রাপ্ত হয়, কিন্তু অকারের চিহ্ন থাকে না। যথা– ক (ক্ + অ), খ (খ্ + অ) ইত্যাদি। অকার দীর্ঘ হলে বা সমস্বর দ্বিত্ব হলে দীর্ঘ অ-কার বা আ-কার হয়। সন্ধির এই সূত্রানুসারে নব + অঙ্কুর = নবাঙ্কুর হয়েছে, কেননা, প্রথম শব্দের শেষ ব-কারের শেষে অ-কার ও অঙ্কুরের শুরুতে অ-কার রয়েছে।

বিবর্তন

পঞ্জাবের উত্তরে টাকরী নামক প্রদেশে টাকরী ভাষা প্রচলিত আছে, তা সংস্কৃত ভাষার অপভ্রংশ। কিন্তু সে ভাষায় স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণে মিলিত হয়ে রূপান্তরিত হয় না। যেমন ‘কা’ লিখতে তারা ‘কআ’, ‘কি’ লিখতে ‘কই’ ব্যবহার করে।

সন্ধির নিয়মে একার বা ওকারান্ত পদের পরবর্তী অ লুপ্ত হলে মাত্রাহীন হকার ‘ঽ’ রূপ ধারণ করে। একে লুপ্ত অকার কহে ‘সোঽহম্’ (সঃ = সো + অহম্ এর অ = ‘ঽ’); নবঃ + অঙ্কুরঃ = নবোঽঙ্কুরঃ –এরূপ স্থলে বকারের পর বিসর্গ ওকারে পরিণত হল এবং অঙ্কুরের অকার লুপ্ত হয়ে গেল। প্রণব (ওঁ = অ + উ + ম) এর আদ্য অক্ষর। তন্ত্রে অকারের সৃষ্টি, অমৃত, ললাট, কণ্ঠ ইত্যাদি ১৭ প্রকার অর্থ আছে, কিন্তু বাংলায় সে সকল অর্থে প্রয়োগ নাই।

অ প্রাচীন বাংলায় এ, ও, য়, এবং হ স্থলে বসত। এখন স্থলে ‘অখন’– “অখনে দেখিয়া আইস পুরী আপনার”– মুকু-জগ-বিজয়। রাখিও স্থলে ‘রাখিঅ’– “না কহিয় কার ঠাই রাখিঅ অন্তরে,”–চম্পককলিকা। নয়ন স্থলে ‘ন্অন’, নায়ক স্থলে ‘নাঅক’ ইত্যাদি। প্রাকৃতে ‘য়’ স্থলে ‘অ’ ব্যাকরণসঙ্গত। প্রাচীন বাংলায় কথার মাত্রাস্বরূপ– কিঅ, কেঅ, তুঅ, লঅ ইত্যাদি চণ্ডীদাসে দ্রষ্টব্য। বৌদ্ধ বা অতি প্রাচীন বাংলায় গ স্থলে– ‘গঅণ’ (গগণ)–চর্যাপদ ৮.২.১৪.৩ ইত্যাদি। চ স্থলে “অনিমিষ লোঅণ (লোচন)।” দোহাকোষ। জ স্থলে–‘গঅবর’ (গজবর), ‘গঅন্দ, গএন্দ’ (গজেন্দ্র)–চর্যাপদ ৮.২.১৪ ইত্যাদি। ‘তেঅ’ (তেজ)–বৌদ্ধগান ও দোহা। ‘নিঅমন’ (নিজমন)– চর্যাপদ। ত, ত্ত স্থলে– ‘পণ্ডিঅ’ (পণ্ডিত), ‘অদভূঅ’, ‘অমিঅ’, ‘অমিআহ’ (অদ্ভুত, অমৃত, অমিতাভ); ‘অনুঅর’, ‘বোহিচিঅ’ (অনুত্তর, বোধিচিত্ত)–বৌদ্ধগান ও দোহা। র স্থলে– ‘কঠিন পূহবিঅ’ (পৃথিবীর)–ঐ।

অ২

  • প্রমিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • দেশী
  • বাংলা
  • অ

বিশেষ্য

১.
[পুংলিঙ্গ] যে রক্ষা করে; বিষ্ণু।
২.
[পুংলিঙ্গ] ব্রহ্মা।
৩.
[পুংলিঙ্গ] শিব।
৪.
[পুংলিঙ্গ] বায়ু।
৫.
[পুংলিঙ্গ] বৈশ্বানর।
৬.
[পুংলিঙ্গ] ব্রহ্ম।
৭.
[স্ত্রীলিঙ্গ] [ ঙীপ্, ঈ] লক্ষ্মী।

তন্ত্রে অকারের আরও অনেকগুলো পর্যায় দেখা যায়। যথা– সৃষ্ট, শ্রীকণ্ঠ, মেধ, কীর্তি, নিবৃত্তি, ব্রহ্মা, বামাদ্যজ, সারস্বত, অমৃত, হর, নরকারি, ললাট, একমাত্রিক, কণ্ঠ, ব্রাহ্মণ, বাগীশ, প্রণবাদ্য।

অ-উ-ম, এই তিন বীজবর্ণে প্রণবের উৎপত্তি। যোগ সাধনের এখানে একটি গূঢ় সন্ধান আছে। যোগীরা বলেন, মন একাগ্র করতে হলে প্রথমাবস্থায় একেবারে, সমস্ত ওঙ্কার উচ্চারণ করবে না। আগে ওঙ্কারের আদ্যক্ষর কেবল অকার জপ করা চাই। নিয়ম হচ্ছে– পদ্মাসন বন্ধন করে উন্নতভাবে বসে মস্তক সম্মুখে বক্র করবে এবং বক্ষের উপর চিবুক লাগাবে। পরে, কণ্ঠের নিম্ন হতে প্লুত অনুদাত্ত স্বরে অকার উচ্চারণ করতে থাকবে। ক্রমে তরঙ্গের ন্যায় বক্র করে অল্পে অল্পে সুর উর্ধে তুলবে এবং প্লুত উদাত্ত স্বরে অকারের উচ্চারণ করবে। পরিশেষে, ক্রমশঃ আবার সুর নামিয়ে প্লুত স্বরিত স্বরে অকার উচ্চারণ করবে। এইরূপ নীচ সুরের অকার হতে অল্পে অল্পে সুর উপরে তুলতে গেলে উকার নিজেই আসে। পরে উপর হতে সুর নামানোর সময় স্বরপতন কালে অনুনাসিক অকার নিজেই এসে পড়ে।

প্রয়োগ

  1. ১.
    ব্রহ্ম – অঃকার কেবল ব্রহ্ম একাক্ষরকোষে।
    অঃ কী কর, অঃ-স্বরূপা রাখ মোরে তোষে॥
    – অন্নদামঙ্গল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, ১৬০০

অ৩

  • প্রমিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • তদ্ভব
  • সংস্কৃত
  • অ

অব্যয়

১.

সাদৃশ্য অর্থে–অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ-সদৃশ; ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য)। সমমব্রাহ্মণে দানম্– মনু সংহিতা ৭.৮৫।

২.

অভাবার্থে– অভাব; অবিদ্যমানতা। “অঘট (ঘটাভাব), অক্রোধ, অলোভ, অহিংসা, অকর্মক” ইত্যাদি। “অবানরা অরামা করিব ধরাতল”–কৃত্তিবাসী রামায়ণ। “অচক্ষু সর্ব্বত্র চান,”–অন্নদামঙ্গল। “অগতির গতি”–ব্রহ্মসঙ্গীত। অবস্তু (no-thing); অনঙ্গ [অ (অন্) + অঙ্গ (অ স্বরবর্ণের পূর্বে থাকলে ‘অ’ স্থানে ‘অন্’ হয়)]। ন পাপং অপাপং।

৩.

অন্যত্ব অর্থে– অন্যত্ব; ভেদ; পৃথগ্‌ভাব। অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্যজাতি)। “কহিলেন-অ- ব্রাহ্মণ নহ তুমি, তাত! তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত!”–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অঘট– ন ঘটঃ অঘটঃ, ঘট ভিন্ন অন্য পদার্থ। অকুপ্য ইত্যাদি। অতৈজসানি পাত্রাণি– মনুসংহিতা ৬.৫৩।

৪.

অল্পতা অর্থে–অল্পতা, ঈষদর্থ, তুচ্ছতা। “অবোধ (অল্পবুদ্ধি); অনায়াস (অল্প আয়াস); অনুদরী (অল্পোদরী, কৃশোদরী বা মন্দোদরী) কন্যা; অজলা (অল্পজলা) নদী; অকেশী (অল্পকেশী) কন্যা; অবস্তু” ইত্যাদি।

৫.

অপ্রশস্ততা অর্থে– অপ্রাশস্ত্য, অবৈধতা। অকাল– ন কালঃ অকালঃ অর্থাৎ অপ্রশস্ত কাল। অপ্রশস্ত, অবৈধ, অশুভ, অপরিণত, অযথা, অযোগ্য ইত্যাদি বোধক– অকালবোধন; অকার্য; অক্ষত্রিয় আচরণ; অলক্ষণ; অসময় ইত্যাদি।

৬.

বিরোধ অর্থে– বিরোধ; প্রতিকূলতা। অনৈসলামী (ইসলামবিরোধী); অসুর (সুরবিরোধী); অহিন্দু আচরণ (হিন্দু-বিরোধী আচরণ); অশাস্ত্রীয় (শাস্ত্র-বিরোধী); অলক্ষ্মী; অজ্ঞান ইত্যাদি। “তৎসাদৃশ্যমভাবশ্চ তদন্যত্বং তদল্পতা। অপ্রাশস্ত্যং বিরোধশ্চ নঞর্থাঃ ষট্ প্রকীর্ত্তিতাঃ॥

৭.

অধিক্ষেপার্থে– আক্রোশ, অধিক্ষেপ। “অজীবনি” ইত্যাদি। পাণিনি ৩.৩.১১২।

৮.

অনর্থকার্থে– (বাংলায়) নিষেধবাচক নয় এমন অনর্থক। “অবৃথা (অর্থাৎ বৃথা); অব্রেথা; অমন্দ; অলোপ; অশঙ্কেত (সঙ্কেত–শ্রীকৃষ্ণকীর্তন)। “শিরোমণি মহাশয়কে আমি কি অতুচ্ছ কত্তে পারি?”– লীলাবতী, ৩৭। “কেন, কলু অমন্দ জাত্‌টা কী?” অমৃত গ্রন্থাবলী ১২৪। আমাতে অচাষা পেয়েছ কিনা (মালদহ)। একথা যদি অব্রেথা হয়, তা হ’লে দশ ঘা জুতো খাব।

বাস্তবিক বিপরীত অর্থে (অর্থাৎ বৃথা মন্দ ইত্যাদি অর্থে) ঐ সকল শব্দ প্রয়োগ করে অশিক্ষিতে সেই অর্থ ঠিক রেখে বাক্য শেষ করতে পারে না, ফলে বিপরীতার্থকই হয়ে যায়। বোধ হয়, এটা ঐরূপ অ-কারের মূল।

ব্যুৎপত্তি

ন (নঞ্) > অ, অন্; নঞ্ তৎপুরুষ সমাসে নকারের লোপ হলে অকার থাকে। নলোপো নঞঃ। পাণিনি ৬.৩.৭৩। অ স্বরবর্ণের পূর্বে থাকলে ‘অ’ স্থানে ‘অন্’ হয়। ন পাপং অপাপং। দেখুন ‘অন্’১ ‘ন’৩। বাংলার এই নঞ্অর্থক উপসর্গ = ইংরেজি নঞ্ অর্থক উপপদ (prefix) a, ib, im, in, no, non, ir, un ইত্যাদির তুল্য। ইংরেজি un, on = আইসল্যান্ডি o (অ) = সুইডিশ o = ডেনিশ u. সংস্কৃতমূলক ভারতীয়, সিংহলী, ব্রহ্ম ইত্যাদি যাবতীয় ভাষার আদ্যক্ষরের উচ্চারণ বাংলা ‘অ’ এবং লঘু আকারযুক্ত হিন্দি ‘অ’র তুল্য। ফিনিক্, হিব্রু, তুর্কী, আরবী, ফার্সী ইত্যাদি সেমেটিক ভাষাগুলির আদ্যক্ষরের উচ্চারণ ‘আলিফ্’ (ا) এবং য়ুরোপীয় বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’ (A, a); গ্রীক ‘অ্যাল্ফা’ (Α, α)। অ নঞ্ তৎপুরুষ সমাসযুক্ত হয়ে অভাব, অল্পতা, অপ্রশস্ততা, অন্যত্ব, সাদৃশ্য ও বিরোধ–এই ৮ প্রকার অর্থ জ্ঞাপন করে। সাধারণতঃ নিষেধবাচক এই অর্থে অ অন্য শব্দের সংযোগ ব্যতীত প্রযুক্ত হয় না।

অ৪

  • প্রমিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • তদ্ভব
  • সংস্কৃত
  • অ

অব্যয়

১.
অনুকম্পা।
২.
অধিক্ষেপ; নিন্দা; তিরস্কার। [অধিক্ষেপে (তিরস্কারে) ক্রিয়াপদ পরে থাকলে নঞের স্থানে অ হয়।]
৩.
সম্বোধন।
৪.
(প্রাচীন বাংলায়) বিষাদ; শোক।

জ্ঞাতব্য

অ অনন্ত, এখানে পূর্বে অকার এবং পরপদের আদিতে অকার আছে, কিন্তু এক স্বরের সঙ্গে সন্ধি হল না। নিপাত একাজনাঙ্। পাণিনি ১.১.১৪। আ ভিন্ন অন্য যে নিপাত একাচ্ তা প্রগৃহ্য সংজ্ঞক হবে, সুতরাং সন্ধি হবে না। বাংলা ভাষায় এইরূপ স্থলে ও, উঃ, এবং আঃ প্রচলিত। ও মূর্খ! তুমি কিছুই জান না? উঃ! কী মনস্তাপ? আঃ! কষ্টের রাত্রি পোহায় না।

প্রয়োগ

অব্যয়

  1. ১.
    বিষাদ; শোক – অ প্রাণ ধারণ না জাএ সুন্দরি রাধে। – শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
  2. ২.
    সম্বোধন – অ মোর সোণার সুত – চৈতন্য মঙ্গল
  3. ৩.
    সম্বোধন – অ মোর রসনা – ভক্তমালগ্রন্থ
  4. ৪.
    সম্বোধন – অ! অনন্ত আগচ্ছ ভোঃ।
  1. ১.
    অধিক্ষেপ; নিন্দা – নঞো নলোপস্তিঙি ক্ষেপে। অ পচসি ত্বং জাল্ম। – কাশিকা বৃত্তি

অ৫

  • অপ্রচলিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • তদ্ভব
  • সংস্কৃত
  • অ

সর্বনাম

১.
এই; এ।

ব্যুৎপত্তি

সংস্কৃত অসৌ > প্রাকৃত অহ > বাংলা অ, হিন্দি যহ; এ৩ দেখুন; অপ্রচলিত।

প্রয়োগ

  1. ১.
    এই – অ-কারণে (এই কারণে); অক ছাড়িয়া (এ স্থান ছেড়ে)ত কহত অখন – বঙ্গসাহিত্য-পরিচয়

অ৬

  • অপ্রচলিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • দেশী
  • বাংলা
  • অ

কারক বিভক্তি

অধিকরণে সপ্তমি বিভক্তি।

ব্যুৎপত্তি

সপ্তমী বিভক্তি ‘য়’৬ > অ; অপ্রচলিত।

প্রয়োগ

  1. ১.
    আড়াঅ বাঘর ভঅ জলত কম্ভীর – শূন্যপুরাণ

অ৭

  • অপ্রচলিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • তদ্ভব
  • সংস্কৃত
  • অ

ক্রিয়া বিভক্তি

  1. সংস্কৃত তে > প্রাচীন এ > বাংলায় (য়ে > য়) অ; অপ্রচলিত। – বর্তমান কালে প্রথম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। চর্যাপদ– “ডমরুলি বাজঅ (অর্থাৎ বাজয়ে) ৪৮; জাঅ; জুঝঅ; বুঝঅ ৫১। কৃত্তিবাসি রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড– রাজা কঅ : না লঅ তোমার মন ১; সব নষ্ট হঅ ৫; লজ্জা হঅ : মনে লঅ ৮; জাঅ প্রজাগণ ১৩; ধাঅ ১৮; চালাঅ সারথি ২০; দেখাঅ ২৭। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড– পলাঅ ১৮; দেঅ ৫৪। শূণ্যপুরাণ– জেবা বাতি জলে হঅ ১১৪; লোটাইয়া জাঅ ১১৫। বিদ্যাপতি– তনু দেঅ চান ২২১।

  2. সংস্কৃত (লট্) থ > প্রাকৃত হ > বাংলা অ– বর্তমান কালে মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার সম্ভ্রমসূচক বিভক্তি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন– “হঅ গরুর রাখোআল, বোল আকশ পাতাল ১০৭। গোরক্ষবিজয়– না বুঝ দশের বোল ৮৯; আর কি পাইতে আস ১৬০। মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা– মম মঙ্গল বাঞ্ছ যদি বিদায় দেহি মোরে ১২২। কৃত্তিবাসী রামায়ণ– হিংসা কর ৫। [বোল– ✔বোল+অ; এইরূপ ‘বুঝ’ ‘আস’ প্রভৃতি।

  3. সংস্কৃত (লোট্) ত, (বৈদিক) থ > প্রাকৃত হ (তুলনামূলক ‘পণমহ, সংস্কৃত প্রণমত।–বাংলা উত্তরহ) > বাংলা অ (সম্ভ্রমে)–হসত > হসহ > হাস (সম্ভ্রমে); সংস্কৃত হস (লোট্–হি) > প্রাকৃত হস > বাংলা হাস্ (অ-লোপ, অসম্ভ্রমে)।– অনুজ্ঞায় মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। মীনচেতন– (সম্ভ্রমে) “ভুঞ্জঅ কদলীদেশ ৫; জাঅ পলাইয়া ১৩; খাঅ ১৯। গোরক্ষবিজয় চাঅ ৬৫; তত্ত্বে দেঅ মন ১৩৬। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড– রাজ উপরে হঅ ৯; বেড়াঅ তুমি ১৩। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন– লঅ ভার কাহ্ন ১৭৪। মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা– অপমান ত্যাগ (অর্থাৎ ত্যাগ কর) বাপু ১২২। মনসামঙ্গল– (অসম্ভ্রমে) লোহা তাতাইয়া কামারগণ করে গণ্ডগোল। কেহ বলে ‘তাতা’ (✔তাতা+অ–তপ্ত কর্) কেহ বলে ‘তোল’॥ ১৬৮।

  4. অঁ > অ, দেখুন ওঁ৩– কর্তৃবাচ্যে বর্তমান কালে উত্তম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। শিবায়ন– “বৈষ্ণব বন্দ (অর্থাৎ বন্দনা করি) : ঋষি বন্দ : দেব বন্দ : তীর্থ বন্দ ইত্যাদি ৪.৫।

অ৮

  • চলিত
  • a
  • ɔ
  • অ
  • দেশী
  • বাংলা
  • অ

বিশেষ্য

১.
[পরিভাষা (বিজ্ঞান)] অক্ষিজন (অ১ অ২ ইত্যাদি)।

ব্যুৎপত্তি

ইংরেজি O– Oxygen-এর সংক্ষেপণের অনুকরণে।

অ৯

  • মধ্য
  • a
  • ɔ
  • অ
  • দেশী
  • বাংলা
  • অ

সর্বনাম

১.
অই; ঐ; এই; সেই।

ব্যুৎপত্তি

প্রাচীন বাংলা। অই সংক্ষেপে ও প্রাদেশিক উচ্চারণে। তুলনামূলখ তে (তে কারণ); তুলনামূলক ই

প্রয়োগ

সর্বনাম

  1. ১.
    এই; সেই –

    সরিষার রূপ হয়য়া দুবায় লুকাইল।

    অ কারণে খেতু কান্দিবার লাগিল।

    – মাণিকচন্দ্র রাজার গান