এডুলিচার শব্দকোষ

১.

/ অ / ɔ / a

বিশেষ্য

অ-কার; বাংলা বর্ণমালার আদ্যবর্ণ; আলিকালির আদ্য অক্ষর; আদ্য স্বর। ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত হলে অন্যান্য স্বর কারে রূপান্তরিত হয়, কিন্তু অকারের চিহ্ন থাকে না (ক্ + অ = ক)। উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ, তাই কণ্ঠ্যবর্ণ। পাণিনি সংবৃত-বিবৃত-ভেদে দুই প্রকার অ-কারের উল্লেখ করেছেন; সংবৃত অ-কারের উচ্চারণে গলনালীর সঙ্কোচ এবং বিবৃত অ-কারের উচ্চারণে গলনালীর বিবার অর্থাৎ প্রসারণ করতে হয়। অ-কার উচ্চারণ সংবৃত কিন্তু সন্ধি প্রভৃতি প্রক্রিয়ায় বিবৃত (পাণিনি ১.১.৯)।

বাংলায় উচ্চারণ প্রধানতঃ ৪ প্রকার— (১) লঘু স্পৃষ্ট (অর্থ, অদ্বৈত ইত্যাদির অ); (২) স্পষ্ট (অতল, অজ, অন্যায় ইত্যাদির অ); (৩) লঘু বা অর্ধব্যক্ত ওকারের মত (কলিকা, রজনী, ললিত ইত্যাদির ক্, জ্, ল্ সংযুক্ত অ = অ, ক, জ, ল); (৫) পূর্ণব্যক্ত ওকারবৎ (অতিশয়, অনুরোধ ইত্যাদির অ বা মন, যদু ইত্যাদির ম্, য্ সংযুক্ত অ = ‘ওতিশয়’, ‘ওনুরোধ’, ‘মোন’ এবং ‘যোদু’)।

একমাত্রাবিশিষ্ট বা হ্রস্ব অ-কারের দ্বিমাত্র বা দীর্ঘ উচ্চারণে আ-কার এবং ত্রিমাত্র বা প্লুত উচ্চারণে প্লুত অ৩-কার হয়। সংস্কৃতে এই অ-ত্রয় হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত এবং সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে ষড়্‌বিধ। বাংলায়ও অ-ত্রয় কণ্ঠজাত, সুতরাং কণ্ঠ্য বর্ণ; কিন্তু সংস্কৃতের ন্যায় বাংলায় আ-কার দীর্ঘ নয়; অ-কারের ন্যায় হ্রস্ব। সুতরাং কেবল আকৃতিতে বাংলায় অ-কার বা আ-কার, সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে চতুর্বিধ; প্লুত অ-কার বা আ-কার ‘গান’, ‘আহ্বান’ প্রভৃতিতে উচ্চারিত হয় মাত্র, এদের ভিন্ন লিখিত আ-কার বাংলায় নেই। সংস্কৃতের অন্য স্বরও হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত উচ্চারিত হয়; কিন্তু বাংলায় দীর্ঘ স্বর, হ্রস্ব স্বরের ন্যায় উচ্চারিত হয় বলে বাংলার অ-ত্রয়ের ন্যায় অন্য হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরেরও উচ্চারণগত কিঞ্চিৎ প্রভেদ আছে।

ব্রজবুলি, হিন্দি ও মরাঠি ভাষার অ-কার ঈষদ্‌বিবৃত অর্থাৎ ঈষৎ স্পৃষ্ট বা লঘু আকারের ন্যায় উচ্চারিত, অর্থাৎ একটু আ-কার ঘেঁষা। তাই ‘অতি’ অনেকটা ‘আতি’র মত। প্রাচীন বাংলায় ‘অতি’ স্থলে ‘আতি’র প্রয়োগও দৃষ্ট হয়। আধুনিক শুদ্ধ উচ্চারণ ‘ওতি’। প্রাচীন বাংলায় চর্যাপদে ‘আঙ্গন’, ‘আণেক’ প্রভৃতি ঐরূপ উচ্চারণমূলক। আধুনিক বাংলায় ‘আগণা (আগনা)’, ‘আচষা (আচশা)’, ‘আতেলা’, ‘আলুণি (আলুনি)’ প্রভৃতির আ-কার ঐরূপেই হয়েছে। সংস্কৃতের ‘শ্বাপদ’, ‘বিশ্বামিত্র’ প্রভৃতির এবং প্রাকৃতের ‘মাণংসী (মনস্বী)’, ‘পারোহ (প্ররোহ)’ ইত্যাদির আ-কার ঐরূপে দীর্ঘ। এতদ্ভিন্ন বাংলায় অ-কারের ও-কারবৎ উচ্চারণ আছে; ‘অনুচর’, ‘অমনি’, ‘রসুই’, ‘লক্ষণ’ ইত্যাদি এর উদাহরণ। সাধারণত অ-কারের পরে অ-কার বা আ-কারযুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে অকারের উচ্চারণ বজায় থাকে; অজ, অজা প্রভৃতির ‘অ’ উচ্চারণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণগুলির অকারান্ত উচ্চারণ বাংলা ভাষারই বিশেষত্ব। অ-কারের পরে ি, ী, ু, ূ, যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে ওকারবৎ উচ্চারণ হয়; অতি, অতীত, অরুণ প্রভৃতি এর উদারহণ। অ-কারের পরে ও-কার বা ঔ-কার থাকলে অ উচ্চারিত হয়; অতো, অহো প্রভৃতি।

সংস্কৃত অভিধানে ‘অ’-কারের হ্রস্ব, দীর্ঘ, প্লুত, অননুনাসিক, উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত ইত্যাদি ১৮ প্রকার উচ্চারণ ও স্বরভেদ রয়েছে।

ইংরেজি un, on; আইসল্যাণ্ডি o (অ); সুইডিশ o; ডেনিশ u. সংস্কৃত-মূলক ভারতীয়, সিংহলী, ব্রহ্ম ইত্যাদি যাবতীয় ভাষার আদ্যক্ষরের উচ্চারণ, ফিনিক্, হিব্রু, তুর্কী, আরবী, ফার্সী ইত্যাদি সেমেটিক ভাষাগুলির আদ্যক্ষরের উচ্চারণ ‘আলিফ্’ এবং য়ুরোপীয় লাতিন বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’; গ্রীক ‘অ্যাল্ফা’ ইত্যাদির উচ্চারণ বাংলা ‘অ’ এবং লঘু আকারযুক্ত হিন্দি ‘অ’র তুল্য।

লুপ্ত অ-কার (ঽ); সন্ধির নিয়মে এ-কার বা ও-কারান্ত পদের পরবর্তী অ লুপ্ত হলে মাত্রাহীন হকার ‘ঽ’ রূপ ধারণ করে; তাকে লুপ্ত অ-কার বলে। ‘সোঽহম্’ (সঃ = সো + অহম্ এর অ = ‘ঽ’)। কতিপয় সংস্কৃত শব্দ ব্যতীত বাংলায় এর ব্যবহার নেই।

প্রণব (ওঁ = অ + উ + ম) এর আদ্য অক্ষর। তন্ত্রে অকারের সৃষ্টি, অমৃত, ললাট, কণ্ঠ ইত্যাদি ১৭ প্রকার অর্থ আছে, কিন্তু বাংলায় সে সকল অর্থে প্রয়োগ নেই।

অ প্রাচীন বাংলায় এ, ও, য়, এবং হ স্থলে বসিত। এখন স্থলে ‘অখন’— ‘অখনে দেখিয়া আইস পুরী আপনার’— মুকুন্দরাম, জগ-বিজয়। রাখিও স্থলে ‘রাখিঅ’— ‘না কহিয় কার ঠাই রাখিঅ অন্তরে’,—চম্পক-কলিকা। নয়ন স্থলে ‘নঅন’, নায়ক স্থলে ‘নাঅক’ ইত্যাদি। প্রাকৃতে ‘য়’ স্থলে ‘অ’ ব্যাকরণ-সঙ্গত। প্রাচীন বাংলায় কথার মাত্রাস্বরূপ—কিঅ, কেঅ, তুঅ, লঅ ইত্যাদি চণ্ডীদাসে দ্রষ্ট্রব্য। বৌদ্ধ বা অতি প্রাচীন বাংলায় গ স্থলে— ‘গঅণ’ (গগণ)—চর্যাপদ পদ ৮। ২। ১৪। ৩ ইত্যাদি। চ স্থলে ‘অনিমিষ লোঅণ (লোচন)।’ দোহাকোষ। জ স্থলে— ‘গঅবর’ (গজবর), ‘গঅন্দ, গএন্দ’ (গজেন্দ্র)—চর্যাপদ পদ ৮। ২। ১৪ ইত্যাদি। ‘তেঅ’ (তেজ)—বৌদ্ধ গান ও দোহা। ‘নিঅমন’ (নিজমন)—চর্যাপদ। ত, ত্ত স্থলে— ‘পণ্ডিঅ’ (পণ্ডিত), ‘অদভূঅ’, ‘অমিঅ’, ‘অমিআহ’ (অদ্ভুত, অমৃত, অমিতাভ); ‘অনুঅর’, ‘বোহি-চিঅ’ (অনুত্তর, বোধিচিত্ত)—বৌদ্ধগান ও দোহা। র স্থলে— ‘কঠিন পূহবিঅ’ (পৃথিবীর)— বৌদ্ধগান ও দোহা।

২.

/ অ / ɔ / a

অব্যয়
  1. যে রক্ষা করে; বিষ্ণু। ‘সেব্যতামক্ষয়ো ধীরাঃ (ধীর + অঃ) সঃ (অমরকোষ)। অকারো বিষ্ণুরুদ্দিষ্টঃ (‘ওম্’ দেখুন)।
  2. ব্রহ্মা।
  3. শিব।
  4. বায়ু।
  5. বৈশ্বানর।
  6. ব্রহ্ম। ‘অঃকার কেবল ব্রহ্ম একাক্ষরকোষে। অঃ কি কর, অঃ-স্বরূপা রাখ মোরে তোষে॥’ —ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
ব্যুৎপত্তি

✓অব্ + অ (ড) -ক; পুংলিঙ্গ

৩.

/ অ / ɔ / a

অব্যয়

নঞ্ (ন্ + অ + ঞ্) এর ‘অ’ মাত্র থেকে তৎপুরুষ সমাসে অন্য শব্দের পূর্বে বসে অভাব, অল্পতা, অপ্রশস্ততা, অন্যত্ব, সাদৃশ্য, বিরোধ, আক্রোশ ইত্যাদি সাত প্রকার অর্থ জ্ঞাপন করে; এছাড়া বাংলায় অনর্থক অ-এর প্রয়োগ রয়েছে।

  1. অভাবার্থে— অকর্মক; অক্রোধ; অগতি (অগতির গতি— ব্রহ্মসঙ্গীত); অঘট (ঘটাভাব); অচক্ষু (অচক্ষু সর্ব্বত্র চান,— অন্নদা মঙ্গল); অনঙ্গ [অ (অন্) + অঙ্গ (অ স্বরবর্ণের পূর্বে থাকলে ‘অ’ স্থানে ‘অন্’ হয়)]; অবস্তু (no-thing); অবিদ্যমানতা; অভাব; অলোভ; অহিংসা। “অবানরা অরামা করিব ধরাতল”— কৃত্তিবাসী রামায়ণ।
  2. অল্পতা, ঈষদর্থ, তুচ্ছতা অর্থে— অকেশী (অল্পকেশী) কন্যা; অজলা (অল্পজলা) নদী; অনায়াস (অল্প আয়াস); অনুদরী (অল্পোদরী, কৃশোদরী বা মন্দোদরী) কন্যা; অবস্তু; অবোধ (অল্পবুদ্ধি)।
  3. অপ্রাশস্ত্য বা অপ্রশস্ততা, অবৈধতা অর্থে; অপরিণত, অপ্রশস্ত, অবৈধ, অযথা, অযোগ্য, অশুভ ইত্যাদি বোধক)— অকার্য; অকাল; অকালবোধন; অক্ষত্রিয় আচরণ; অপশু (অপ্রশস্ত পশু); অলক্ষণ; অসময় ইত্যাদি।
  4. অন্যত্ব, ভেদ, পৃথগ্‌ভাব অর্থে— অকুপ্য; অঘট (ঘট ভিন্ন অন্য পদার্থ); অতৈজসানি পাত্রাণি—মনু; অপট (পটভিন্ন—ঘটাদি); অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্যজাতি), ‘কহিলেন— অ-ব্রাহ্মণ নহ তুমি, তাত! তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত!’— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
  5. সাদৃশ্য অর্থে— অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ-সদৃশ; ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য), সমমব্রাহ্মণে দানম্ — মনুসংহিতা, যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যারত্ন সংশোধিত। বাংলায় এই অর্থে প্রয়োগ বিরল।
  6. বিরোধ, প্রতিকুলতা অর্থে—অজ্ঞান; অলক্ষ্মী; অশাস্ত্রীয় (শাস্ত্র-বিরোধী); অসুর (সুরবিরোধী)।
  7. আক্রোশ, অধিক্ষেপ। ‘অজীবনি’ ইত্যাদি। পাণিনি ৩.৩.১২২।
  8. বাংলায় অনর্থক অর্থাৎ নিষেধবাচক নয় অর্থে— অচাষা (চাষা— ‘আমাকে অচাষা পেয়েছ কিনা।’); অতুচ্ছ (তুচ্ছ— ‘শিরোমণি মহাশয়কে আমি কি অতুচ্ছ কত্তে পারি?’— লীলাবতী); অবৃথা (বৃথা); অব্রেথা (বৃথা— ‘এ কথা যদি অব্রেথা হয়, তা হ’লে দশ ঘা জুতো খাব।’); অমন্দ (মন্দ— ‘কেন, কলু অমন্দ জাত্‌টা কি?’ অমৃতগ্রন্থাবলী, প্রথম ভাগ, বসুমতী।); অলোপ (লোপ); অশঙ্কেত (সঙ্কেত—শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন)।
ব্যুৎপত্তি

ন (নঞ্) > অ, অন্ — হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়; নঞ্ (ন্ + অ + ঞ্) > অ— জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস; সাধারণত নিষেধবাচক অর্থে ‘অ’ অন্য শব্দের সংযোগ ব্যতীত ব্যবহার হয় না। তৎপুরুষ সমাসে ব্যঞ্জনাদি উত্তরপদের পূর্বে ‘নঞ্’-এর ‘ন’-স্থানে ‘অ’, স্বরাদি উত্তরপদের পূর্বে ‘ন’-স্থানে ‘অন্’ হয়। দ্রষ্টব্য ‘অন্’, ‘ন’; বাংলার এই নঞ্অর্থক উপসর্গ ইংরেজি নঞ্ অর্থক উপপদ (prefix) a, ib, im, in, no, non, ir, un; German, Gothic un; Greek a, an; Latin in ইত্যাদির তুল্য।

৪.

/ অ / ɔ / a

অব্যয়
  1. অনুকম্পা।
  2. অধিক্ষেপ, নিন্দা।
  3. সম্বোধন; ‘অ অনন্ত।’ ‘অ মোর সোণার সুত’— চৈতন্য মঙ্গল। ‘অ মোর রসনা’— ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
  4. সংস্কৃত অহো— বাংলায় খেদ, বিষাদ, শোক ইত্যাদি অর্থে। ‘অ প্রাণ ধারণ না জাএ সুন্দরি রাধে।’— শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন।

৫.

/ অ / ɔ / a

সর্বনাম

অই, এ, এই, ঐ, সেই। ‘অ-কারণে (এই কারণে)’; ‘অক ছাড়িয়া (এ স্থান ছাড়িয়া)’; ‘কহত অখন (এখন)’ — বঙ্গসাহিত্য পরিচয়।

ব্যুৎপত্তি

সংস্কৃত অসৌ > প্রাকৃত অহ > প্রাচীন বাংলায় অ, হিন্দি যহ; দ্রষ্টব্য ‘এ’; অপ্রচলিত।

৬.

/ অ / ɔ / a

বিশেষ্য
  1. [বিজ্ঞান] অক্ষিজন বা অক্সিজেন (অ ইত্যাদি)।
  2. অম্লজানের সাঙ্কেতিক চিহ্ন — অ◦।

৭.

/ অ / ɔ / a

কারকবিভক্তি

অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি। আড়াঅ বাঘর ভঅ জলত কুম্ভীর— শূণ্যপূরাণ।

ব্যুৎপত্তি

সপ্তমী বিভক্তি য় > অ; অপ্রচলিত।

৮.

/ অ / ɔ / a

ক্রিয়াবিভক্তি
  1. বর্তমান কালে প্রথম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। ‘ডমরুলি বাজঅ (বাজয়ে)’, ‘জাঅ’, ‘জুঝঅ’, ‘বুঝঅ’ — চর্যাপদ; ‘রাজা কঅ : না লঅ তোমার মন’, ‘সব নষ্ট হঅ’, ‘লজ্জা হঅ : মনে লঅ’, ‘জাঅ প্রজাগণ’, ‘ধাঅ’, ‘চালাঅ সারথি’স ‘দেখাঅ’—কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অযোদ্ধাকাণ্ড। ‘পলাঅ’, ‘দেঅ’—কৃত্তিবাসী রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড। ‘জেবা বাতি জলে হঅ’, ‘লোটাইয়া জাঅ’—শূণ্যপুরাণ। ‘তনু দেঅ চান’—বিদ্যাপতি।
  2. [সংস্কৃত (লট্) থ > প্রাকৃত হ > বাংলা অ] বর্তমান কালে মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার সম্ভ্রমসূচক বিভক্তি। ‘হঅ গরুর রাখোআল, বোল আকাশ পাতাল’— শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন। ‘না বুঝ দশের বোল’; ‘আর কি পাইতে আস’—গোরক্ষ বিজয়। ‘মম মঙ্গল বাঞ্ছ যদি বিদায় দেহি মোরে’ —মঙ্গলচণ্ডী পাঞ্চালিকা; ‘হিংসা কর’ —কৃত্তিবাসী রামায়ণ। [বোল— ✓বোল + অ; এইরূপ ‘বুঝ’, ‘আস’ প্রভৃতি।]
  3. সংস্কৃত (লোট্) ত, (বৈদিক) খ > প্রাকৃত হ (তুলনামূলক ‘পণমহ, সংস্কৃত প্রণমত। — বা উত্তরহ) > বাংলা অ (সম্ভ্রমে) —হসত > হসহ > হাস (সম্ভ্রমে); সংস্কৃত হস (লোট্—হি) > প্রাকৃত হস > হাস্ (অ-লোপ, অসম্ভ্রমে)। অনুজ্ঞায় মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। (সম্ভ্রমে) ‘ভুঞ্জঅ কদলীদেশ; জাঅ পলাইয়া; খাঅ’— মীনচেতন। ‘চাঅ’; ‘তত্ত্বে দেঅ মন’ —গোরক্ষ বিজয়। ‘রাজ উপরে হঅ’; ‘বেড়াঅ তুমি’ —কৃত্তিবাসী রামায়ণ। ‘লঅ ভার কাহ্ন’ —শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন। ‘অপমান ত্যাগ (ত্যাগ কর) বাপু’— মঙ্গলচনণ্ডীপাঞ্চালিকা। (অসম্ভ্রমে) ‘লোহা তাতাইয়া কামারগণ করে গণ্ডগোল। কেহ বলে ‘তাতা’ (✓তাতা + অ — তপ্ত কর্) কেহ বলে তোল॥’ — মনসা মঙ্গল।
  4. [অঁ > অ, দ্রষ্টব্য ওঁ] কর্তৃবাচ্যে বর্তমান কালে উত্তম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। ‘বৈষ্ণব বন্ধ (অর্থাৎ বন্দনা করি); ঋষি বন্দ; দেব বন্দ; তীর্থ বন্দ ইত্যাদি— শিবায়ন।
ব্যুৎপত্তি

সংস্কৃত তে > প্রাকৃত এ > বাংলা (য়ে > য়) অ; অপ্রচলিত।

৯. প্রয়োগ

  1. অব্যয়, ব্রহ্ম। ‘অকার হকার বর্ণ আকার সংযুক্ত।’ রামপ্রসাদ সেন, ১৭৮৫।
  2. অব্যয়, ব্রহ্ম। ‘অঃকার কেবল ব্রহ্ম একাক্ষরকোষে। অঃ কি কর, অঃ-স্বরূপা রাখ মোরে তোষে॥’ —ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
  3. বিভক্তি, ‘সুণ মায় যশোদাঅ তোহ্মারে বুঝাওঁ।’ বড়ু চণ্ডীদাস, ১৪৫০।
  4. সংস্কৃত অহো— বাংলায় খেদ, বিষাদ, শোক ইত্যাদি অর্থে। ‘অ প্রাণ ধারণ না জাএ সুন্দরি রাধে।’— শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন।
  5. সম্বোধন; ‘অ অনন্ত।’ ‘অ মোর সোণার সুত’— চৈতন্য মঙ্গল। ‘অ মোর রসনা’— ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
  6. সম্বোধন। ‘অ প্রাণ সুণিআঁ কি বুলিহে বলভদ্র ভাই।’ বড়ু চণ্ডীদাস, ১৪৫০।
  7. সর্বনাম, এই। ‘সরিষার রূপ হয়য়া দুবায় লুকাইল। অ কারণে খেতু কান্দিবার লাগিল।’— মাণিকরাম গাঙ্গুলী, ধর্ম্মমঙ্গল, ১৭৮১।

বাঙ্গালা ভাষার অভিধান

১.

—অকার; বাংলা বর্ণমালার আদ্যবর্ণ; আলিকালির আদ্য অক্ষর; আদ্য স্বর। ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত হইলে অন্যান্য স্বর রূপান্তর প্রাপ্ত হয়, কিন্তু অকারের চিহ্ন থাকে না (ক্ + অ = ক)। উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ, তাই কণ্ঠ্যবর্ণ। বাংলায় উচ্চারণ প্রধানতঃ ৪ প্রকার— (১) লঘু স্পৃষ্ট (অর্থ, অদ্বৈত ইত্যাদির অ); (২) স্পষ্ট (অতল, অজ, অন্যায় ইত্যাদির অ); (৩) লঘু বা অর্দ্ধব্যক্ত ওকারের মত (কলিকা, রজনী, ললিত ইত্যাদির ক্, জ্, ল্ সংযুক্ত অ = অ̑, ক̑, জ̑, ল̑); (৪) পূর্ণব্যক্ত ওকারবৎ (অতিশয়, অনুরোধ ইত্যাদির অ বা মন, যদু ইত্যাদির ম্, য্ সংযুক্ত অ = ‘ওতিশয়’, ‘ওনুরোধ’, ‘মোন’ এবং ‘যোদু’)। ব্রজবুলি এবং হিন্দীতে ঈষৎ স্পৃষ্ট বা লঘু আকারের ন্যায় উচ্চারিত, তাই ‘অতি’ অনেকটা ‘আতি’র মত। প্রাচীন বাংলা— ‘অতি’ স্থলে ‘আতি’র প্রয়োগও দৃষ্ট হয়। আধুনিক শুদ্ধ উচ্চারণ ‘ওতি’। ‘অজ’র ‘অ’ উচ্চারণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণগুলির অকারান্ত উচ্চারণ বাঙ্গালা ভাষারই বিশেষত্ব। ভূমিকায় উচ্চারণ দ্রষ্টব্য। সাধারণতঃ অ পরে অকার বা আকারযুক্ত ব্যঞ্জন থাকিলে অকারের উচ্চারণ বজায় থাকে (অজ, অজা); ি, ী, ু, ূ, যুক্ত ব্যঞ্জন থকিলে ওকারবৎ (অতি, অতীত, অরুণ) এবং পরে ো থাকিলে অ (অতো, অহো)। ‘অ’র হ্রস্ব, দীর্ঘ, প্লুত, অননুনাসিক, উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত ইত্যাদি ১৮ প্রকার উচ্চারণ ও স্বরভেদ সংস্কৃত অভিধানে দ্রষ্টব্য। সাধারণতঃ নিষেধবাচক এই অর্থে অ অন্য শব্দের সংযোগ ব্যতীত প্রযুক্ত হয় না। ইহা নঞ্ এই অব্যয়ের রূপান্তর স্বরূপ। নঞ্ (ন্ + অ + ঞ্) এর ‘অ’ মাত্র থাকিয়া অন্য শব্দের পূর্ব্ববর্ত্তী তৎপুরুষ সমাসযুক্ত হইয়া অভাব, অল্পতা, অপ্রশস্ততা, অন্যত্ব, সাদৃশ্য ও বিরোধ এই ৬ প্রকার অর্থ জ্ঞাপন করে। অভাবার্থে— “অচক্ষু সর্ব্বত্র চান,” —অন্নদা মঙ্গল। “অগতির গতি” —ব্রহ্মসঙ্গীত। অবস্তু (no-thing); অনঙ্গ [অ (অন্) + অঙ্গ (অ স্বরবর্ণের পূর্ব্বে থাকিলে ‘অ’ স্থানে ‘অন্’ হয়)] অল্পতা অর্থে— অবোধ (অল্পবুদ্ধি); অনায়াস (অল্প আয়াস); অনুদরী (অল্পোদরী, কৃশোদরী বা মন্দোদরী) কন্যা। অপ্রশস্ততা অর্থে— (অপ্রশস্ত, অবৈধ, অশুভ, অপরিণত, অযথা, অযোগ্য ইত্যাদি বোধক) অকালবোধন; অক্ষত্রিয় আচরণ; অলক্ষণ; অসময় ইত্যাদি। অন্যত্ব অর্থে— অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্যজাতি)। “কহিলেন—অ-ব্রাহ্মণ নহ তুমি, তাত! তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত!” —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অঘট (ঘট ভিন্ন অন্য পদার্থ)। সাদৃশ্য অর্থে—অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণ-সদৃশ; ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য)। এই অর্থে বিরল। বিরোধ অর্থে—অসুর (সুরবিরোধী); অহিন্দু আচরণ (হিন্দু-বিরোধী আচরণ); অশাস্ত্রীয় (শাস্ত্র-বিরোধী ইত্যাদি)। [বাংলার এই নঞ্অর্থক উপসর্গ = ইংরেজি নঞ্ অর্থক উপপদ (prefix) a, ib, im, in, no, non, ir, un ইত্যাদির তুল্য। ইংরেজি un, on = আইসল্যাণ্ড— o (অ) = সুইডিশ— o = ডেনিশ— u. সংস্কৃতমূলক ভারতীয়, সিংহলী, ব্রহ্ম ইত্যাদি যাবতীয় ভাষার আদ্যক্ষরের উচ্চারণ বাংলা ‘অ’ এবং লঘু আকারযুক্ত হিন্দি ‘অ’র তুল্য। ফিনিক্, হিব্রু, তুর্কী, আরবী, ফার্সী ইত্যাদি সেমেটিক ভাষাগুলির আদ্যক্ষরের উচ্চারণ ‘আলিফ্’ এবং য়ুরোপীয় বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’; গ্রীক ‘অ্যাল্ফা’] সন্ধির নিয়মে একার বা ওকারান্ত পদের পরবর্ত্তী অ লুপ্ত হইলে মাত্রাহীন হকার ‘ঽ’ রূপ ধারণ করে। ইহাকে লুপ্ত অকার কহে ‘সোঽহম্’ (সঃ = সো + অহম্ এর অ = ‘ঽ’)। প্রণব (ওঁ = অ + উ + ম) এর আদ্য অক্ষর। তন্ত্রে অকারের সৃষ্টি, অমৃত, ললাট, কণ্ঠ ইত্যাদি ১৭ প্রকার অর্থ আছে, কিন্তু বাংলায় সে সকল অর্থে প্রয়োগ নাই। অ প্রাচীন বাংলায় এ, ও, য়, এবং হ স্থলে বসিত। এখন স্থলে ‘অখন’— “অখনে দেখিয়া আইস পুরী আপনার”—মুকু-জগ-বিজয়। রাখিও স্থলে ‘রাখিঅ’— “না কহিয় কার ঠাই রাখিঅ অন্তরে,” —চম্পক-কলিকা। নয়ন স্থলে ‘ন্অন’, নায়ক স্থলে ‘নাঅক’ ইত্যাদি। প্রাকৃতে ‘য়’ স্থলে ‘অ’ ব্যাকরণ-সঙ্গত। প্রাচীন বাংলায় কথার মাত্রাস্বরূপ— কিঅ, কেঅ, তুঅ, লঅ ইত্যাদি চণ্ডীদাসে দ্রষ্টব্য। বৌদ্ধ বা অতি প্রাচীন বাংলায় গ স্থলে— ‘গঅণ’ (গগণ)— চর্যাপদ ৮।২।১৪।৩ ইত্যাদি। চ স্থলে “অনিমিষ লোঅণ (লোচন)।” দোহাকোষ। জ স্থলে— ‘গঅবর’ (গজ-বর), ‘গঅন্দ, গএন্দ’ (গজেন্দ্র)— চর্যাপদ ৮।২।১৪ ইত্যাদি। ‘তেঅ’ (তেজ)—বৌদ্ধগান ও দোহা। ‘নিঅমন’ (নিজমন)— চর্যাপদ। ত, ত্ত স্থলে— ‘পণ্ডিঅ’ (পণ্ডিত), ‘অদভূঅ’, ‘অমিঅ’, ‘অমিআহ’ (অদ্ভুত, অমৃত, অমিতাভ); ‘অনুঅর’, ‘বোহি-চিঅ’ (অনুত্তর, বোধিচিত্ত)— বৌদ্ধ গান ও দোহা। র স্থলে— ‘কঠিন পূহবিঅ’ (পৃথিবীর)—ঐ।

২.

—অব্যয় শব্দ; অনুকম্পা; সম্বোধন; খেদ ইত্যাদি অর্থে (প্রাচীন বাংলা)। “অ প্রাণ ধারণ না জাএ সুন্দরি রাধে।” —শ্রীকৃষ্ণ কীর্ত্তন। ২ বিশেষ্য, বিষ্ণু। —মেদিনীকোষ। ৩ ব্রহ্ম। “অকার কেবল ব্রহ্ম একাক্ষর কোষে।” —অন্নদা মঙ্গল।

৩.

[বিজ্ঞান] অক্ষিজন (অ ইত্যাদি)।

৪.

[প্রাচীন বাংলা। অই সংক্ষেপে ও প্রাদেশিক উচ্চারণে। তুলনামূলক— তে (তে কারণ); তুলনামূলক— ই] সর্বনাম, অই, ঐ, এই, সেই। “সরিষার রূপ হয়য়া দুবায় লুকাইল। অ কারণে খেতু কান্দিবার লাগিল।”—মাণিকগাঙ্গুলীল ধর্ম্মমঙ্গল।

৫.

◦ —বিশেষ্য, অম্লজানের সাঙ্কেতিক চিহ্ন।

বঙ্গীয় শব্দকোষ

১.

স্বরবর্ণের আদ্য বর্ণ। [ইহার উচ্চারণ-স্থান কণ্ঠ; ইহা কণ্ঠ্য বর্ণ। পাণিনি সংবৃত-বিবৃত-ভেদে দুই প্রকার অ-কারের উল্লেখ করিয়াছেন; সংবৃত অ-কারের উচ্চারণে গলনালীর সংঙ্কোচ এবং বিবৃত অ-কারের উচ্চারণে গলনালীর বিবার অর্থাৎ প্রসারণ করিতে হয়। অ-কার উচ্চারণে সংবৃত কিন্তু সন্ধিপ্রভৃতি প্রক্রিয়ায় বিবৃত (পা ১.১.৯)। একমাত্রাবিশিষ্ট বা হ্রস্ব অ-কারের দ্বিমাত্র বা দীর্ঘ উচ্চারণে আ-কার এবং ত্রিমাত্র বা প্লুত উচ্চারণে প্লুত অ-কার হয়। এইরূপ মাত্রাভেদ থাকিলেও এই ত্রিবিধ অ-কার সবর্ণ। সংস্কৃতে এই অ-ত্রয় হ্রস্ব দীর্ঘ প্লুত এবং সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে ষড়্‌বিধ। বাঙ্‌লায়ও অ-ত্রয় কণ্ঠজাত, সুতরাং কণ্ঠ্য বর্ণ; কিন্তু সংস্কৃতের ন্যায় বাঙ্‌লার আ-কার দীর্ঘ নহে; অ-কারের ন্যায় হ্রস্ব। সুতরাং কেবল আকৃতিতে বাঙ্‌লায় অ-কার ও আ-কার, সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক ভেদে চতুর্ব্বিধ, প্লুত অ-কার বা আ-কার ‘গান’ ‘আহ্বান’ প্রভৃতিতে উচ্চারিত হয় মাত্র, উহাদের ভিন্ন লিখিত আ-কার বাঙ্‌লায় নাই। সংস্কৃতের অন্য স্বরও হ্রস্ব দীর্ঘ প্লুত উচ্চারিত হয়; কিন্তু বাঙ্‌লায় দীর্ঘ স্বর, হ্রস্ব স্বরের ন্যায় উচ্চারিত হয় বলিয়া বাঙ্‌লার অ-ত্রয়ের ন্যায় অন্য হ্রস্ব দীর্ঘ স্বরেরও উচ্চারণগত কিঞ্চিৎ প্রভেদ আছে। হিন্দি মরাঠী প্রভৃতি ভাষার অ-কার ঈষদ্‌-বিবৃত, অর্থাৎ একটু আ-কার ঘেঁষা। প্রাচীন বাঙ্‌লায় চর্য্যাপদে ‘আঙ্গন’ ‘আন্তে’ (অন্তে) ইত্যাদির ও শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তনে ‘আচেতন’ ‘আর্জ্জুন’ ‘আণেক’ প্রভৃতি শব্দের আ-কার ঐরূপ উচ্চারণমূলক। আধুনিক বাঙ্‌লায় ‘আগণা’ ‘আচষা’ ‘আতেলা’ ‘আলুণি’ প্রভৃতির আ-কার ঐরূপেই হইয়াছে। সংস্কৃতের ‘শ্বাপদ’ ‘বিশ্বামিত্র’ প্রভৃতির এবং প্রাকৃতের ‘মাণংসী’ (মনস্বী) ‘পারোহ’ (প্ররোহ) ইত্যাদির আ-কার ঐরূপে দীর্ঘ। এতদ্ভিন্ন বাঙ্‌লায় অ-কারের ও-কারবৎ উচ্চারণ আছে; ‘অনুচর’ ‘অমনি’ ‘রসুই’ ‘লক্ষণ’ ইত্যাদি ইহার উদাহরণ।]

২.

পুং [✓অব্ + অ (ড) -ক] যে রক্ষা করে; বিষ্ণু। “সেব্যতামক্ষয়ো ধীরাঃ (ধীর+অঃ) সঃ (অ.কো)। অকারো বিষ্ণুরুদ্দিষ্টঃ (দ্র ‘ওম্’)। ব্রহ্মা। শিব। বায়ু। বৈশ্বানর। ব্রহ্ম। “অঃকার কেবল ব্রহ্ম একাক্ষরকোষে। অঃ কি কর, অঃ-স্বরূপা রাখ মোরে তোষে॥ ভা.চ ৪২৯।

৩.

ব্য [ন (নঞ্) > অ, অন্ (তৎপুরুষ-সমাসে, ব্যঞ্জনাদি উত্তরপদ পরে ‘নঞ্’ এর ‘ন’-স্থানে ‘অ’, স্বরাদি উত্তরপর পরে ‘ন’-স্থানে ‘অন্’); দ্র ‘অন্’ ‘ন’; cf. Gr. a, an; L. in; Ger., Gothic—un; E. in, un] সাদৃশ্য। “অব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণসদৃশ— ক্ষত্ত্রিয়াদি)। সমমব্রাহ্মণে দানম্ মনু ৭.৮৫। অভাব, অবিদ্যমানতা। “অঘট (ঘটাভাব), অক্রোধ, অলোভ, অহিংসা, অকর্ম্মক ইত্যাদি। অবানরা অরামা করিব ধরাতল কৃ ২৮৬। ৩ অন্যত্ব, ভেদ, পৃথগ্‌ভাব। “অপট (পটভিন্ন—ঘটাদি), অকুপ্য ইত্যাদি। অতৈজসানি পাত্রাণি মনু ৬.৫৩। অল্পতা, ঈষদর্থ, তুচ্ছতা। “অজলা (অল্পজলা) নদী; অকেশী কন্যা; অবস্তু ইত্যাদি। অপ্রাশস্ত্য, অবৈধতা। “অপশু (অপ্রশস্ত পশু), অকার্য্য, অকাল, অসময় ইত্যাদি। বিরোধ, প্রতিকুলতা। “অসুর (সুরবিরোধী), অলক্ষ্মী, অজ্ঞান ইত্যাদি। “তৎসাদৃশ্যমভাবশ্চ তদন্যত্বং তদল্পতা। অপ্রাশস্ত্যং বিরোধশ্চ নঞর্থাঃ ষট্ প্রকীর্ত্তিতাঃ॥” আক্রোশ, অধিক্ষেপ। “অজীবনি ইত্যাদি। পা ৩.৩.১১২। (বাঙ্‌লায়) নিষেধবাচক নহে, অর্থাৎ অনর্থক। “অবৃথা (অর্থাৎ বৃথা), অব্রেথা, অমন্দ, অলোপ, ‘অশঙ্কেত’ (সঙ্কেত—শ্রী.কী)। শিরোমণি মহাশয়কে আমি কি অতুচ্ছ কত্তে পারি? লী ৩৭। কেন, কলু অমন্দ জাত্‌টা কি? অ.গ্র ১২৪। আমাকে অচাষা পেয়েছ কিনা (মালদহ)। একথা যদি অব্রেথা হয় তা হ’লে দশ ঘা জুতো খাব। [বাস্তবিক বিপরীত অর্থে (অর্থাৎ বৃথা মন্দ ইত্যাদি অর্থে) ঐ সকল শব্দ প্রয়োগ করিয়া, অশিক্ষিতে সেই অর্থ ঠিক রাখিয়া বাক্য শেষ করিতে পারে না, ফলে বিপরীতার্থকই হইয়া যায়। বোধ হয়, ইহা ঐরূপ ‘অ’-কারের মূল।]

৪.

অনুকম্পা। “পা ১.১.১৪। অধিক্ষেপ, নিন্দা। “পা ৬.৩.৭৪। সম্বোধন। “অ অনন্ত (A.)। অ মোর সোণার সুত চৈ.ম ৩৮। অ মোর রসনা ভ.গ্র ৩৬৮। [সং অহো] (বাঙ্‌লায়) বিষাদ, শোক। “অ প্রাণধারণ না জাএ সুন্দরি রাঁধে শ্রী.কী ৩২৩।

৫.

সর্ব্ব [সং অসৌ > প্রা অহ > বা অ, হিন্দি ৱহ; দ্র ‘এ; অপ্র] এই, এ। “অ-কারণে (এই কারণে) ব.প ৫৭; অক ছাড়িয়া (এ স্থান ছাড়িয়া) ৮১; কহত অখন ৬১৪।

৬.

কা.ক্তি [সপ্তমী বিভক্তি য় > অ; অপ্র] অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি। আড়াঅ বাঘর ভঅ জলত কুম্ভীর শূ ৫৫।

৭.

ক্রি. ক্তি [সং তে > প্রা এ > বা (য়ে > য়) অ; অপ্র] বর্ত্তমান কালে প্রথম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। “ডমরুলি বাজঅ (অর্থাৎ বাজয়ে) চ ৪৮; জাঅ, জুঝঅ, বুঝঅ ৫১। রাজা কঅঃ না লঅ তোমার মন কৃ.অ ১; সব নষ্ট হঅ ৫; লজ্জা হঅঃ মনে লঅ ৮; জাঅ প্রজাগণ ১৩; ধাঅ ১৮; চালাঅ সারথি ২০; দেখাঅ ২৭। পলাঅ কৃ.উ ১৮; দেঅ ৫৪। জেবা বাতি জলে হঅ শূ ১১৪; লোটাইয়া জাঅ ১১৫। তনু দেঅ চান বি.প ২২১। [সং (লট্) থ > প্রা হ > বা অ] বর্ত্তমান কালে মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার সম্ভ্রমসূচক বিভক্তি। “হঅ গরুর রাখোআল, বোল আকাশ পাতাল শ্রী.কী ১০৭। না বুঝ দশের বোল গো. বি ৮৯; আর কি পাইতে আস ১৬০। মম মঙ্গল বাঞ্ছ যদি বিদায় দেহি মোরে ম.পা ১২২। হিংসা কর কৃ ৫। [বোল — ✓বোল + অ; এইরূপ ‘বুঝ’ ‘আস’ প্রভৃতি] সং (লোট্) ত, (বৈদিক) থ > প্রা হ (তু ‘পণমহ, সং প্রণমত। — বা উত্তরহ) > বা অ (সম্ভ্রমে) — হসত > হসহ > হাস (সম্ভ্রমে); সং হস (লোট্—হি) > প্রা হস > বা হাস্ (অ-লোপ, অসম্ভ্রমে)।] অনুজ্ঞায় মধ্যম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। (সম্ভ্রমে) “ভুঞ্জঅ কদলীদেশ মী ৫; জাঅ পলাইয়া ১৩; খাঅ ১৯। চাঅ গো. বি ৬৫; তত্ত্বে দেঅ মন ১৩৬। রাজ উপরে হঅ কৃ অ ৯; বেড়াঅ তুমি ১৩। লঅ ভার কাহ্ন শ্রী.কী ১৭৪। অপমান ত্যাগ (অর্থাৎ ত্যাগ কর) বাপু ম.পা ১২২। (অসম্ভ্রমে) লোহা তাতাইয়া কামারগণ করে গণ্ডগোল। কেহ বলে ‘তাতা’ (✓তাতা + অ — তপ্ত কর্) কেহ বলে ‘তোল’॥ ম.ম ১৬৮। [অঁ > অ, দ্র ওঁ] কর্ত্তৃবাচ্যে বর্ত্তমান কালে উত্তম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি। “বৈষ্ণব বন্দ (অর্থাৎ বন্দনা করি) : ঋষি বন্দ : দেব বন্দ : তীর্থ বন্দ ইত্যাদি শি ৪.৫।

সংসদ বাংলা অভিধান

১.

বাংলা বর্ণমালার আদ্য স্বর; প্রথম স্বরবর্ণ।

২.

অব্যয়, সম্বোধন খেদ ইত্যাদি সূচক ধ্বনি (অ ভাই, অ কী দুঃখ); বটে, তাই, হুঁ।

৩.

অব্যয়, সমাসে অন্য পদের পূর্বে ‘নঞ্’ এই অব্যয়ের স্থানবর্তী হয়ে অভাবাদি অর্থ প্রকাশ করে, যথা— অভাব অর্থে (অযত্ন, অভয়), বিরোধ বা বৈপরীত্য (অসুর, অধর্ম), অন্যত্ব (অহিন্দু, অবাঙালি), অল্পতা (অজন্মা, অবোধ), অপ্রশস্ততা বা অযোগ্যতা (অকাল, অকর্ম); পরবর্তী পদের প্রথম বর্ণ স্বরবর্ণ হলে অ-স্থানে অন্ হয় (অন্+ইচ্ছা অনিচ্ছা, এইভাবে অনায়াস, অনলস)।

পরবর্তী নিবন্ধ

অনুসৃত অভিধান