বাংলা ভাষার বিপুল শব্দভাণ্ডার, তার দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস এবং বহুমাত্রিক জ্ঞান-ঐতিহ্যকে একত্রে ধারণ করার লক্ষ্যেই এই বৃহদভিধান রচিত। এটি কেবল একটি সাধারণ শব্দকোষ নয়; বরং বাংলা ও বঙ্গীয় ভাষাসমূহের যতদূর সম্ভব সর্বাধিক বিস্তৃত শব্দসংগ্রহ, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং সমাজজীবনের বিচিত্র উপাদান বর্ণানুক্রমে সন্নিবেশিত হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রমিত, চলিত, কথ্য, আঞ্চলিক, প্রাচীন, মধ্যবাংলা, অপ্রচলিত ও বর্জিত— সকল স্তরের শব্দকে সমান গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে পুরোনো সাহিত্যপাঠ থেকে শুরু করে আধুনিক ভাষা-গবেষণা পর্যন্ত নানা প্রয়োজনে এটি নির্ভরযোগ্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
এই অভিধানে সংস্কৃত, বাংলা, আরবি, ফারসি, হিন্দি, পালি, ইংরেজি, ফরাসি এবং অন্যান্য বিদেশি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় আত্তীকৃত শব্দসমূহকে তাদের অর্থ, ব্যুৎপত্তি ও উৎস-পরিচয়সহ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি শব্দের উৎস ভাষা নির্দেশ করার পাশাপাশি তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশী, বিদেশী ও মিশ্র— এই শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শব্দের প্রথম লিখিত প্রয়োগ, অর্থের ক্রমবিকাশ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণও সংযোজিত হয়েছে। ব্যুৎপত্তি নির্ধারণে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাশ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রামাণ্য অভিধানকারদের মতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অভিধানটিকে ব্যবহারিক ও গবেষণামূলক উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ করার জন্য প্রায় প্রতিটি শব্দের বাংলা উচ্চারণ অনুসারে রোমান বানান, সংস্কৃত শব্দের আন্তর্জাতিক মানের IAST লিপ্যন্তর এবং বাংলা উচ্চারণের আন্তর্জাতিক ধ্বনিলিপি (IPA) যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি শব্দের প্রমিত, চলিত, কথ্য, আঞ্চলিক বা ঐতিহাসিক বানান-রূপও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশ করা হয়েছে। অধিকাংশ শব্দের ক্ষেত্রে উদাহরণবাক্য সংযোজনের চেষ্টা করা হয়েছে এবং সম্ভব হলে গ্রন্থ, লেখক ও ব্যবহারের সালও উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে শব্দের প্রকৃত ব্যবহার ও অর্থবৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।
ভাষার গণ্ডি অতিক্রম করে এই বৃহদভিধানে ধর্ম, দর্শন, পুরাণ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিস্তৃত পরিসরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, রিজাল, বৈদিক সাহিত্য, পুরাণ, তন্ত্র, ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, ছন্দ, ন্যায়, জ্যোতিষ, গণিত, উদ্ভিদতত্ত্ব, প্রাণিতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, রসায়ন, বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, বৈদ্যক ও হাকিমি চিকিৎসাপদ্ধতি, কৃষিতত্ত্ব, শিল্প, ইন্দ্রজাল ও পাকবিদ্যাসহ নানা শাস্ত্রের প্রয়োজনীয় পারিভাষিক শব্দ ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় এতে স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে প্রাচীন ও আধুনিক ধর্মসম্প্রদায়, তাদের মতবাদ, ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ব্যক্তিত্ব, কৌরাণিক চরিত্র, প্রসিদ্ধ গ্রন্থ, স্থাননাম এবং ভৌগোলিক পরিচয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অভিধানটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বাংলা ভাষার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবহারের নানা স্তরকে সংরক্ষণ করা। এতে বাংলা ভাষায় প্রচলিত সংস্কৃত, হিন্দি ও বিদেশি প্রবচন, প্রবাদ-প্রবচন, ব্যক্তিনাম, স্থাননাম, ডাকনাম, নামের সংক্ষিপ্ত রূপ, আরবি ও ফারসি নামের বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, প্রচলিত সংক্ষেপ (abbreviation), মুদ্রণচিহ্ন, প্রুফ-সংশোধনের সংকেত, পরিমাপ ও সংখ্যাবাচক শব্দ, প্রাচীন ও আধুনিক মুদ্রা এবং মেট্রিক বা ফরাসি দশমিক পরিমাপপদ্ধতির বিবরণও সন্নিবেশিত হয়েছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বহু কাল্পনিক, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উল্লেখ ও প্রবাদগত অর্থও যথাসম্ভব সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বাংলা বানানের ইতিহাস ও মান্য রূপের প্রতিও এই অভিধান সমান মনোযোগী। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত ও প্রকাশিত ১৯৩৭ সালের “বাংলা বানানের নিয়ম”-এর প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা, প্রতিবর্ণীকরণ পদ্ধতি, বিদেশি নামের বিশুদ্ধ উচ্চারণ এবং প্রয়োজনীয় সংযোজন ও সংশোধনও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা নামধাতু, ধ্বন্যাত্মক শব্দ থেকে উৎপন্ন ধাত্বর্থ এবং পাঠ-সহায়ক বিন্যাসের মাধ্যমে অভিধানটিকে শিক্ষার্থী, গবেষক, লেখক, সম্পাদক ও সাধারণ পাঠকের জন্য আরও কার্যকর করে তোলা হয়েছে।
এই বৃহদভিধানের অন্যতম নীতি হলো প্রচলন বা অপ্রচলনের বিচারে নয়, বরং ভাষার ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্বের বিচারে শব্দকে মূল্যায়ন করা। তাই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পারিভাষিক শব্দের পাশাপাশি সাহিত্যে ব্যবহৃত বহু অল্পপ্রচলিত, আঞ্চলিক ও প্রাচীন শব্দও সমানভাবে স্থান পেয়েছে। ফলে এটি কেবল সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান নয়; বরং বাংলা ভাষার অতীত, বর্তমান ও উত্তরাধিকারের এক বিস্তৃত শব্দভাণ্ডার, যা ভাষাপ্রেমী, সাহিত্যপাঠক, গবেষক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও প্রামাণ্য তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে।